সোমবার-১৮ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং-৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, সময়: দুপুর ১২:০৪, English Version
‘ইভটিজিং প্রতিরোধে দলবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ করো’ — বাংলাদেশ ব্যাংকে উদেষ্টা সিতাংশু কুমার সুর চৌধুরী জলঢাকায় এ্যাড, মমতাজুল হকের রোগমুক্তি কামনা করে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবিগঞ্জ বিআরটিএ অফিসে জেলা প্রশাসকের  অভিযান ৩ আটক :: কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ  সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির নীতিমালা প্রকাশ মিয়ানমারের পেঁয়াজ টিসিবিতে বিক্রি শুরু, কেজি ৪৫ টাকা লালপুরে নিজের পাওয়ার ট্রলির চাপায় চালক নিহত! আরামকোর দাম দেড় লক্ষ কোটি ডলার ছাড়িয়ে

সিরিজ জয়ের আনন্দে মিশে আশঙ্কাও

প্রকাশ: সোমবার, ৩০ জুলাই, ২০১৮ , ১১:২৯ পূর্বাহ্ণ , বিভাগ : খেলাধুলা,

মুক্তিনিউজ২৪.কম ডেস্ক: ৯ বছর পর… : দীর্ঘ ৯ বছর অপেক্ষার পর বিদেশের মাটিতে প্রথম ওয়ানডে সিরিজ জয়, তা-ও টেস্ট বিভীষিকার ধাক্কা সামলে— প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে পোড় খাওয়া মাশরাফির কণ্ঠও কেঁপে ওঠে চাপা আবেগে। দলের সাফল্যে অনেক দিন পর আনন্দে যোগদানের অনুমোদনও মেলে ‘ইয়াং ব্রিগেডে’রও। ট্রফি হাতে তাঁদের প্রত্যেকেই আলাদা করে ছবি তুলেছেন। কে জানে হয়তো ট্রফি ছুঁয়ে শপথও নিয়েছেন এমন উপলক্ষ অনাগত ভবিষ্যতে তৈরি করবেন তাঁরাও। ছবি : এএফপি

মঞ্চ তৈরি করা ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য। সেন্ট কিটসের উইকেট আর মাঠের আকৃতির সুবিধা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে টর্নেডো বইয়ে দেবেন ক্রিস গেইল আর এভিন লুইস, তাতে সিরিজ থেকে উড়ে যাবেন মাশরাফি বিন মর্তুজারা। তবে ক্যারিবীয় এই ব্লুপ্রিন্টের দুর্বোধ্য কোড ভেঙে জিতেছে বাংলাদেশ। দীর্ঘ ৯ বছর অপেক্ষার পর বিদেশের মাটিতে প্রথম ওয়ানডে সিরিজ জয়, তা-ও টেস্ট বিভীষিকার ধাক্কা সামলে—প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে পোড় খাওয়া মাশরাফির কণ্ঠও কেঁপে ওঠে চাপা আবেগে। দলের সাফল্যে অনেক দিন পর আনন্দে যোগদানের অনুমোদনও মেলে ‘ইয়াং ব্রিগেডে’রও। ট্রফি হাতে তাঁদের প্রত্যেকেই আলাদা করে ছবি তুলেছেন। কে জানে হয়তো ট্রফি ছুঁয়ে শপথও নিয়েছেন এমন উপলক্ষ অনাগত ভবিষ্যতে তৈরি করবেন তাঁরাও।

পুরস্কার বিতরণীর সময় পুরো দল যখন মঞ্চের কাছে দাঁড়িয়ে, তখন সারিবদ্ধ দলের পেছনে ওয়ার্নার পার্কের সবুজ ঘাসে আধশোয়া মাশরাফি। চোখ পড়তেই চেনা হাসি, তা থেকে ঠিকরে পড়ছে দারুণ কোনো অর্জনের গৌরব। বিদেশের মাটিতে যে দলের পিঠে হারের পর হার লেখা, সে দলের ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জেতার আবেগ তো একটু বেশি ছুঁয়ে যাবেই। অধিনায়কের নিজের জন্য এ সিরিজ তো ছিল সব প্রতিকূলতাকে জয় করারও। দেশে বসে দেখেছেন টেস্ট বিপর্যয়। ওদিকে অসুস্থতায় বিপর্যস্ত তাঁর নিজের পরিবার। প্র্যাকটিস সেভাবে করা হয়নি। দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন দেরিতে, ওয়ানডে সিরিজে নামার আগে একমাত্র প্রস্তুতি ম্যাচেও বোলিং করা হয়নি তাঁর। সেই তিনিই এ সিরিজে সবচেয়ে বেশি উইকেটের মালিক। রাতে ডিনারের পর বিরামহীন আড্ডার ফাঁকে ম্যান অব দ্য সিরিজ তামিম ইকবাল আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘মাশরাফি ভাই, আপনাকে একটা পুরস্কার দেওয়া উচিত ছিল।’ অধিনায়কের তাতে কোনো হেলদোল নেই। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসির মর্মার্থ একটাই—যা পেয়েছি, তার তুলনায় একটা ব্যক্তিগত পুরস্কার তো অতি সামান্য ব্যাপার।

ঝট করে ম্যাচ শেষের পড়ন্ত বিকেলে মাশরাফির কথাটা মনে পড়ে গেল, ‘জানেন তো কী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এখানে এসেছি। শরীর, মন—কোনোটাই চলছিল না। তবু এসেছি প্রচণ্ড ক্ষুধা নিয়ে। একটা পারপাস ছিল। আজ সেটা পূর্ণ হলো।’ যেভাবে বারবার গলা ধরে আসছিল, তাতে মনে হচ্ছিল এই না পুরোপুরি ভেঙে পড়েন মাশরাফি! যিনি ভেঙে পড়া পুরো দলকে জোড়া লাগিয়ে সিরিজ জিতেছেন, তাঁর নিজের কি আবেগে ভেঙে পড়লে চলে? উল্টো ম্যাচের পর টিম মিটিং করেছেন তিনি। সতীর্থদের ধন্যবাদ জানিয়ে মনে করিয়ে দিয়েছেন ভবিষ্যতের কথাও। সিনিয়রদের কল্যাণে জেতা সিরিজের আত্মবিশ্বাস নিয়ে জুনিয়রদেরও জেগে ওঠার তাগিদ দিয়েছেন। আসন্ন টি-টোয়েন্টি সিরিজের জন্য শুভ কামনার সঙ্গে শুনিয়েছেন আত্মবিশ্বাসে ভর করে রাজ্য জয়ের গল্পও, ‘নিজের ওপর বিশ্বাস রাখলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। আজকে (রবিবার) আমরা সেটা করেছি। টি-টোয়েন্টিতেও যেন এই আত্মবিশ্বাসটা থাকে। শুভ কামনা।’

ওদিকে পুরো দলকে ডিনারে নিমন্ত্রণ করেছেন বিসিবির দুই পরিচালক গোলাম মোর্তজা ও হানিফ ভূইয়া। টিম হোটেলের পাশেই ভারতীয় একটি রেস্টুরেন্টে। খাওয়া কী হলো কে জানে, তবে খেলোয়াড়-কর্মকর্তা-পৃষ্ঠপোষক-সম্প্রচারকর্মী আর সিরিজ কাভার করতে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে উড়ে আসা সাংবাদিকদের চোখে-মুখে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে মিশে স্বস্তি। টেবিলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বাঁকা চোখে তাকান রুবেল হোসেন। ডেথ ওভারের বোলিং নিয়ে কম কথা তো আর শুনতে হয়নি তাঁকে। সেই তাঁর করা ৪৯তম ওভারটাকেই সিরিজ নির্ধারণী অনেকগুলো ফ্যাক্টরের অন্যতম বলে মনে করছেন অধিনায়ক স্বয়ং, ‘রুবেল ওই ওভারটায় অসাধারণ বোলিং করেছে। ম্যাচ জিতে গেছি তখনই। মানুষ খালি ওর মার খাওয়া ওভারগুলোর কথা মনে রাখে। বুঝতে চায় না যে ওরকম সময় যেকোনো বোলারই মার খেতে পারে।’ রুবেল নিজে অবশ্য প্রতিক্রিয়া জানান শুধু বাঁকা হাসি আর অভিব্যক্তিতে। দূরের টেবিল থেকে একজনের কণ্ঠই শোনা যাচ্ছে বেশি—তিনি মেহেদী মিরাজ। মাশরাফির কাছে এ সিরিজে যাঁর নৈপুণ্য, ‘আউটস্ট্যান্ডিং’। তামিম ইকবালের দৃষ্টিতে মাঠের সবচেয়ে ‘ইনভলভড ক্যারেক্টার’ তরুণ এ অফস্পিনার। হঠাৎ কোথা থেকে এসে রোভমান পাওয়েল যখন মারতে শুরু করেছেন, তখন চেঁচিয়ে সতীর্থদের অনুপ্রাণিত করে গেছেন তিনি। যত দিন যাচ্ছে, বাংলাদেশ ক্রিকেটের রক্ষাকবচ হয়ে ওঠা সিনিয়রদের মনে ততই আস্থা বাড়াচ্ছেন মেহেদী মিরাজ। সমসাময়িকদের কাছে অনায়াসে অনুকরণীয় হতে পারেন তিনি।

.ডিনারের টেবিল থেকে একটু পরপরই ভেসে আসে এর-ওর, সবচেয়ে বেশি মুশফিকুর রহিমের উচ্চকিত কণ্ঠ। বিশেষ কারণও কি নেই? গায়ানায় দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ফুলটসে আউট হওয়ার গ্লানি তাঁকে না পুড়িয়ে পারে না। সিরিজ জয়ে সে গ্লানি মুছে যাওয়ার প্রগলভতায় আক্রান্ত মুশফিক ডিনার শেষের উন্মুক্ত আড্ডায় সরব। তবে মধ্যমণি অধিনায়ক স্বয়ং। এর-ওর অনুকরণ করে মাতিয়ে রাখেন আড্ডা। তাঁর ‘লেগপুলিং’ থেকে ছাড় পান না কেউই! আর মাশরাফিকে ছাড়েন না তাঁর দেশি-বিদেশি ভক্তরা। রেস্টুরেস্টের ভারতীয় কর্মীরা মাশরাফিকে ঘিরে ধরেন ছবি তোলার জন্য। সেই ভিড় থেকে গলা উঁচিয়ে পাশে বসা তামিম আর মাহমুদ উল্লাহকে প্রশংসায় ভাসিয়ে দেন অধিনায়ক।

দল জিতেছে, তাতে আনন্দের উপলক্ষ তো আছেই। তবে এই জয় আর দলের ভালো খেলার মাঝে সূক্ষ্ম যে পার্থক্য আছে, সেটি মনে করিয়ে দিতেও ভোলেননি মাশরাফি, ‘এই সিরিজটা আমরা জিতলাম তামিম, সাকিব, মুশফিক আর রিয়াদের কল্যাণে। দলে ছোটখাটো অনেকগুলো ঘাটতির জায়গা রয়ে গেছে। বিশেষ করে তরুণদের কথাই বলব। মিরাজ আর মুস্তাফিজ ছাড়া বাকিরা সেভাবে ভালো করতে পারেনি। আশা করি ওরা এটা বুঝতে পারছে। ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে তৈরি করবে সেভাবে। তবে একটা কথা পরিষ্কার করে বলতে চাই, শৃঙ্খলার সঙ্গে কোনো রকম আপস করব না। সবাইকে ডিসিপ্লিনড থাকতে হবে।’

ইঙ্গিতটা একজনকে ঘিরে, সাব্বির রহমান। মাঠে ফর্মে নেই। অথচ মাঠের বাইরে একটার পর একটা কাণ্ড ঘটিয়েই চলেছেন তিনি। সবশেষ এক ফেসবুক ইউজারকে তাঁর ইনবক্সে অশ্লীল ভাষায় আক্রমণের অভিযোগ উঠেছে সাব্বিরের বিরুদ্ধে। তবে অভিযুক্তের দাবি, তাঁর অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে কে বা কারা অভিযোগকারীকে ইনবক্স করেছে। দল ছেড়ে ফ্লোরিডা হয়ে নিউ ইয়র্কে রওনা হবেন তিনি। তাই সিরিজ জয়ের রাতেই নিজের রুমে ব্যাগ গোছানোর ব্যস্ততার মাঝেও টিম ম্যানেজার রাবীদ ইমামকে অনুরোধ করেছেন মাশরাফি, ‘রাবিদ ভাই, দেখেন তো ওর অ্যাকাউন্ট হ্যাকড হওয়ার ঘটনাটি ঠিক কি না।’

হায়রে অধিনায়ক! মরা দলকে চাঙ্গা করো, এই বয়সেও শরীরটাকে বয়ে নিয়ে পারফরম করো, দলে এর এই সমস্যা তো ওর ওই ঝামেলা মেটাও—অ্যাসাইনমেন্ট শেষ হলেও দায়িত্বের যেন শেষ নেই মাশরাফির। তামিম ইকবালের বিড়বিড় করে বলা কথাগুলো যেন চরম সত্য, ‘আরেকজন মাশরাফি এ জীবনে বাংলাদেশ পাবে বলে মনে হয় না!’

সাফল্যের সাগরে আনন্দে ভেসে বেড়ানো বাংলাদেশ দলের অনেক আক্ষেপের এটা একটা। জেতা সিরিজেও নন-পারফরমাররা আড়াল পাচ্ছেন না। মাশরাফির অনুপস্থিতি নেতৃত্ব সংকটকেও করে তুলছে প্রকট—এই এত দিন পরও। সিরিজ জয় তো যাবতীয় সব সমস্যার সাময়িক একটা আবরণ মাত্র!

সূত্র: কালের কণ্ঠ

আপনার মতামত লিখুন

খেলাধুলা বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ