শুক্রবার-১৫ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং-৩০শে কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, সময়: ভোর ৫:৫৭
অবহেলায় বিলুপ্তির পথে স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন কয়ারপাড়া জামে মসজিদ গাইবান্ধার পরীক্ষা কেন্দ্রে মোবাইল নিয়ে প্রবেশ, সাত শিক্ষার্থী বহিষ্কার গোবিন্দগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় এসিল্যান্ড নিহত হওয়ার ঘটনায় পিবিআইর তদন্তের নির্দেশ শিবগঞ্জে সড়ক পরিবহন আইন ও সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক সচেতনামূলক লিফলেট বিতরণ লালমনিরহাটে নতুন সড়ক আইন প্রচারণায় পুলিশের লিফলেট বিতরণ হিলিতে এইচআইভি এইডস প্রতিরোধে জনসচেতনতামুলক সভা অনুষ্ঠিত ঠাকুরগাঁওয়ে বাল্যবিবাহের চেষ্টা, কাজী ও বরকে কারাদণ্ড

উনিশেই ফুরিয়ে যাবেন আয়মান!

প্রকাশ: সোমবার, ১০ জুলাই, ২০১৭ , ৭:১৫ পূর্বাহ্ণ , বিভাগ : খেলাধুলা,

মুক্তিনিউজ২৪.কম ডেস্ক: তরুণ এই খেলোয়াড়রা প্রত্যেকে নিজেদের প্রতিভার দ্যুতি ছড়িয়েছেন। এখন বড় মঞ্চে শুধু জ্বলে ওঠার অপেক্ষা। বিভিন্ন খেলায় আগামীর সম্ভাবনাময়দের নিয়ে এই ধারাবাহিক আয়োজনে আজ থাকছে ব্যাডমিন্টনের আয়মান ইবনে জামানের কথা। লিখেছেন শাহজাহান কবির

 

কামরুজ্জামান রতন, মধ্যবয়সী ব্যবসায়ী। সন্ধ্যায় বন্ধুদের নিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলেন। খেলার জন্যই শুধু খেলা না, শরীরের মেদ ঝেড়ে ফেলাটাও একটা উদ্দেশ্য। আট বছরের ছেলেকে প্রায়ই সঙ্গে করে নিয়ে আসেন, আবদার মেটাতে তাকে খেলাতেও নিতে হয়। এভাবে খেলতে খেলতে একসময় বন্ধুরাই বলা শুরু করল, ‘রতন, তোর ছেলে তো বেশ ভালো খেলে। আই কন্টাক্ট ভালো, বুদ্ধিও আছে। ওকে ট্রেনিং করালে তো বড় খেলোয়াড় হবে। ’

কথাগুলো বাবার মনেও গেঁথে গিয়েছিল। এরপর ছুটিতে যখন মালয়েশিয়ায় ঘুরতে গেলেন, ছেলেকে দিন সাতেকের জন্য সেখানকার নামি একটি ব্যাডমিন্টন একাডেমিতে অনুশীলনের ব্যবস্থা করে দিলেন। পরেরবার গিয়েও তা-ই করলেন। ঢাকায় ফিরে বন্ধুদের সেই ব্যাডমিন্টন আসরেও চলল চর্চা। এ সময় অনূর্ধ্ব-১৩ পর্যায়ে দেশব্যাপী একটা টুর্নামেন্ট হলো, ছেলেকে পরখ করতে নিয়ে রতন অভিভূত। কারণ সে যে চ্যাম্পিয়নই হয়ে গেছে সে আসরে। বাবার মনে ছেলেকে বড় খেলোয়াড় বানানোর স্বপ্নটা আরো পোক্ত হয়ে যায় তাতে। ছুটিতে মালয়েশিয়া, ব্যাংককে প্রশিক্ষণ চলে তার, দেশে ফিরে সেখানকার রুটিন অনুযায়ীই চলে অনুশীলন। ২০১৩-তে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে ফিরল বাংলাদেশ গেমস। রতন তনয় তখন যথেষ্টই আত্মবিশ্বাসী। দেশের শীর্ষ পর্যায়ের খেলোয়াড়দের সঙ্গে যখন সে লড়াইয়ে নামছে, তখন তার বয়স ১৫-ও পার হয়নি, শেষ হয়নি ‘ও’ লেভেল। কিন্তু গেমসের সবচেয়ে বড় চমকটাই উপহার দিল সে। ব্যাডমিন্টনের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে জিতে নিল জাতীয় পর্যায়ের এই শিরোপা। সাতবারের চ্যাম্পিয়ন আহসান হাবিব ছিলেন, রইসউদ্দিন, মোহাম্মদ জাভেদের মতো নিয়মিত পারফরমাররা ছিলেন, আগের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপেই প্রথম শিরোপা জেতা এনামের শিরোপা ধরে রাখার মিশন ছিল। কিন্তু সবাইকে ছাপিয়ে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নের খেতাব জিতে নিল ১৫ বছর বয়সের সেই কিশোর—আয়মান ইবনে জামান।

দেশের তথাকথিত ব্যাডমিন্টন চর্চা, তারকা খেলোয়াড়দের অসারতা প্রমাণ হয় তাতে। একজন কামরুজ্জামানই যেন দেখিয়ে দেন উন্নতির সঠিক পথটা। আয়মান এর পরের দুটি জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপেও (২০১৪ ও ২০১৫) ধরে রেখেছেন শিরোপা। অর্থাত্ এই মুহূর্তে টানা তিনবারের জাতীয় চ্যাম্পিয়ন তিনি। এই সময়ের মধ্যে একটি প্রথম বিভাগ লিগ খেলারও সৌভাগ্য হয়েছে তাঁর। ঢাকা গ্ল্যাডিয়টর্সের হয়ে খেলে সেই আসরেও তিনি চ্যাম্পিয়ন। ২০১৩-তে বাংলাদেশ গেমস জয়ের কীর্তি গড়ার পর ছেলে সামর্থ্য নিয়ে তো আর কোনো সন্দেহই ছিল না বাবার, ফেডারেশনও তাঁকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয়। ওই বছরই তাই এশিয়ান যুব গেমসে খেলা হয় আয়মানের। চীনের নানজিংয়ে বাংলাদেশের অন্য অ্যাথলেটদের কাছ কেবল হতাশার খবর এলেও সেই আসরে আয়মান অন্তত শেষ ষোলোতে খেলতে পেরেছিলেন, ২০১৪ কমনওয়েলথ গেমসে অংশ নিয়েও একমাত্র খেলোয়াড় তৃতীয় রাউন্ডে ওঠেন আয়মান। এই সময়ে জার্মানি, জাপান, সিঙ্গাপুর, কোরিয়ায় বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক জুনিয়র আসরে খেলার সুযোগ হয় তাঁর। আর সেই সব আসরে খেলোয়াড় ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মান থেকেই আয়মান নতুন করে আবার চেনেন তাঁকে, ‘তখন আমি বুঝতে পারি বিশ্ব পর্যায়ের ব্যাডমিন্টন কোন পর্যায়ে আছে। তাদের সঙ্গে সমান তালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো প্রশিক্ষণ আমাদের একেবারেই নেই। ওই পর্যায়ে যেতে হলে শুধু এই খেলাটাতেই থাকতে হয় ধ্যান-জ্ঞান, প্রশিক্ষণে থাকতে হয় বছরজুড়ে’—উচ্চতর সেই প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেই ফেডারেশনের। আয়মানের কথায় ‘সেই পর্যায়ে যাওয়ার কথা তারা (ফেডারেশন) যেন ভাবেই না। ’ বাবা কামরুজ্জামানই ছেলেকে আরো কয়েকবার দেশের বাইরে পাঠান প্রশিক্ষণের জন্য, মালয়েশিয়ার পাশাপাশি থাইল্যান্ডেও কয়েক দফায় গিয়েছে আয়মান। এ নিয়ে আট দফায় দেশের বাইরে তাঁর প্রশিক্ষণের সুযোগ হয়েছে, প্রতিবারই খরচ জুগিয়েছেন বাবা, ফেডারেশন এগিয়ে আসেনি একবারও। তাতে আয়মান দেশসেরা হলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সত্যিই কিছু করে দেখানোর মতো তৈরি হতে পারেননি। এর মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে গেছেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন কম্পিউটার সায়েন্সে। খেলা থেকে এখন একটু একটু করে মনোযোগ সরে যেতে শুরু করেছে তাঁর। সর্বশেষ সামার ওপেন খেলেননি, পড়াশোনার চাপে দেশে হওয়া আন্তর্জাতিক ব্যাডমিন্টন চ্যালেঞ্জও বাদ দিয়েছেন, সামনে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে শিরোপা ধরে রাখতে খেলবেন কি না, এ নিয়ে তাঁর মধ্যে সংশয়, ‘সত্যি বলতে আমি কোনো উত্সাহ পাচ্ছি না। যেখানে উন্নতির সুযোগ নেই, সেটা ধরে পড়ে থাকার কি অর্থ হয়! আমি এখন তাই পুরোপুরি পড়াশোনা নিয়েই আছি। ’ বাবা কামরুজ্জামান তাতে আহত হন, কিন্তু ছেলের যুক্তির কাছে পেরেও ওঠেন না, ‘আমি তো চাই ও যে করে হোক খেলাটা চালিয়ে যাক। কিন্তু ও বলে এখানে ক্যারিয়ার নেই। তাঁর ইংলিশ মিডিয়ামের বন্ধুদের কেউ ব্যাডমিন্টনে নেই। এখানে যদি থাকতেই হয়, তাহলে সে আরো উন্নত পরিবেশ চায়, তা তো নেই। লিগের সময় ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্স ওর সঙ্গে পাঁচ বছরের চুক্তি করে। কিন্তু ওই একবারের আসরের পর আর লিগই হয় না, খবর নেয় না গ্ল্যাডিয়েটর্সও। এটা তো আসলেই সুস্থ কোনো পরিবেশ না। ’ উনিশেই সম্ভাবনার পাশাপাশি তাই আয়মানের ফুরিয়ে যাওয়ার গল্প শুনতে হয়, সত্যিই ফুরিয়ে যাবেন অসাধারণ এই প্রতিভা?

আপনার মতামত লিখুন

খেলাধুলা বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ