সোমবার-৩০শে মার্চ, ২০২০ ইং-১৬ই চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, সময়: রাত ১২:৩৩, English Version
উমাদিনী ত্রিপুরার মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক ডোমার পৌর শহরে চলছে জীবাণু নাশক ছিটানো কার্যক্রম। লালপুরে দুস্থদের মাঝে নিজ উদ্যোগে খাবার সামগ্রী বিতরণ পার্বতীপুরে করোনা ঠেকাতে আদা, লং, কালিজিরার চা খাওয়ার গুজব! চাঁপাইনবাবগঞ্জে খেটে খাওয়া গরীব দুঃখি মানুষের মাঝে চাল বিতরণ শুরু ‘করোনা চিকিৎসায় ২৫০ ভেন্টিলেটর প্রস্তুত’ সংবাদপত্র সংক্রান্ত সকল ধরনের কাজ পরিচালনায় কোনো বাধা নেই

কিয়ামতের আগের ভয়াবহ ফিতনা

প্রকাশ: শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২০ , ১২:২৬ অপরাহ্ণ , বিভাগ : ধর্ম,

এমএন২৪.কম ডেস্ক :  ফিতনা শব্দটি আমরা প্রায়ই শুনে থাকি। এই শব্দটি আমাদের কাছে বহুল ব্যবহৃত ও পরিচিত হলেও এর সঠিক অর্থ আমরা অনেকেই জানি না। ফিতনা থেকে বাঁচতে হলে ফিতনা সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। জানতে হবে ফিতনার আলামতগুলো সম্পর্কে। আজকে আমরা সেই বিষয়গুলো নিয়েই আলোচনা করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

ফিতনা কাকে বলে?

‘ফিতনা’ শব্দটি আরবি। এর অর্থ নৈরাজ্য, অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা, অন্তর্ঘাত, চক্রান্ত, বিপর্যয়, পরীক্ষা প্রভৃতি। অভিধানবিদ আজহারি বলেন, ‘আরবি ভাষায় ফিতনার সামগ্রিক অর্থ পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আগুনে পুড়িয়ে সোনার আসল-নকল ও মান যাচাইপ্রক্রিয়া বোঝাতে ফিতনা শব্দের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতেও এরূপ অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হতে দেখা যায়।’ ‘সেদিন তাদের আগুনে পোড়ানো হবে।’ (তাহজিবুল লুগাহ, ১৪/২৯৬)

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না?’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত : ২) উল্লিখিত আয়াতে ‘য়ুফতানুন’ শব্দটি ‘ফিতনা’ থেকে এসেছে, যা পরীক্ষার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের ফিতনার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, আল্লাহর কাছে ফিতনা হত্যা অপেক্ষা মারাত্মক। (সুরা বাকারা, আয়াত : ২১৭)

প্রিয় নবী (সা.) স্বীয় উম্মতদের ফিতনার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। রাসুল (সা.)-এর বিভিন্ন হাদিসে ফিতনার বিভিন্ন আলামত সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। নিম্নে এ ধরনের কিছু হাদিস তুলে ধরা হলো।

ইলম উঠে যাওয়া

ইলম উঠে যাওয়া কিয়ামতের অন্যতম আলামতগুলোর একটি। পাশাপাশি এটি উম্মতের মাঝে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ একটি ফিতনা। মানুষ আলেমদের অবমূল্যায়ন করতে শুরু করবে। ফলে প্রকৃত ইলম আস্তে আস্তে উঠে যাবে। মানুষ বিভ্রান্ত হতে থাকবে। সবাই নিজেকে আল্লামা ভাবতে শুরু করবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, অবশ্যই কিয়ামতের আগে এমন একটি সময় আসবে যখন সব জায়গায় মূর্খতা ছড়িয়ে পড়বে এবং ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে। (বুখারি, হাদিস : ৭০৬২)

মুসলমানদের মধ্যে লড়াই

বর্তমানে রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিগত কারণে মুসলমানরাই মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করে। একে অপরকে দমানোর জন্য সব পদক্ষেপই গ্রহণ করে বসে। রাসুল (সা.) মুসলমানদের নিজেদের মধ্যে এমন বিবাদে জড়ানো ফিতনা বলে আখ্যায়িত করেছেন। আহনাফ ইবনে কায়স (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি (সিফফিনের যুদ্ধে) এক ব্যক্তিকে (আলী রা.)-কে সাহায্য করতে যাচ্ছিলাম। আবু বাকরাহ্ (রা.)-এর সঙ্গে আমার দেখা হলে তিনি বললেন, ‘তুমি কোথায় যাচ্ছ?’ আমি বললাম, ‘আমি এ ব্যক্তিকে সাহায্য করতে যাচ্ছি।’ তিনি বললেন, ‘ফিরে যাও। কারণ আমি আল্লাহর রাসুল (সা.) কে বলতে শুনেছি যে দুজন মুসলমান তাদের তরবারি নিয়ে মুখোমুখি হলে হত্যাকারী এবং নিহত ব্যক্তি উভয়ে জাহান্নামে যাবে।’ আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এ হত্যাকারী (তো অপরাধী), কিন্তু নিহত ব্যক্তির কী অপরাধ? তিনি বললেন, (নিশ্চয়ই) সেও তার সাথিকে হত্যা করার জন্য উদগ্রীব ছিল।’ (বুখারি, হাদিস : ৩১)

হত্যাকাণ্ড বেড়ে যাওয়া

শুধু তাই নয়, রাসুল (সা.) বলেছেন, সেই সত্তার শপথ! যাঁর হাতে আমার জীবন, দুনিয়া ধ্বংস হবে না যে পর্যন্ত না মানুষের কাছে এমন এক যুগ আসে, যখন হত্যাকারী জানবে না যে কি দোষে সে অন্যকে হত্যা করেছে এবং নিহত লোকও জানবে না যে কি দোষে তাকে হত্যা করা হচ্ছে। জিজ্ঞেস করা হলো, কিভাবে এমন অত্যচার হবে? তিনি জবাবে বললেন, সে যুগটা হবে হত্যার যুগ। এরূপ যুগের হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়েই জাহান্নামি হবে। (মুসলিম, হাদিস : ৭১৯৬)

প্রযুক্তির উৎকর্ষতা ও বড় বড় দালান

ফিতনার যুগে প্রযুক্তিগত দিক থেকে মানুষ অনেক দূর এগিয়ে যাবে। বড় বড় দালানকোঠা হবে, পাহাড় কেটে সুড়ঙ্গ পথ নির্মাণ করা হবে। যা বর্তমানে আমরা খুব স্বাভাবিক বিষয় হিসেবেই দেখছি। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, যখন মক্কা শরিফের টিলার উদর বিদীর্ণ করা হবে আর নির্মিত ভবনগুলো মক্কা শহরের পাহাড়গুলোর চেয়ে উঁচু হবে তখন মনে কর ফিতনার সময় সন্নিকটে। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা : ৭/৪৬১)

পূর্বেকার হাদিসের ব্যাখ্যাকাররা আলোচ্য হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এখন তো মক্কা শরিফ পাথুরে ভূমি এবং পাহাড়ি এলাকা, তবে ভবিষ্যতে কোনো কালে আল্লাহ তাআলা এ শহরে নদী এবং খাল-বিল সৃষ্টি করবেন। কিন্তু আজকের সুরঙ্গ পথগুলো দেখে বোঝা যাচ্ছে যে, কিভাবে মক্কা নগরীর টিলাগুলো বিদীর্ণ করা হয়েছে। আর উঁচু বিল্ডিং নির্মাণের দিক থেকে পৃথিবী এতটাই এগিয়েছে যে মানুষ এখন স্বপ্ন দেখছে আকাশের কোনো একটি গ্রহাণু থেকে ঝুলন্ত বিল্ডিং নির্মাণ করবে। নিউ ইয়র্কের ক্লাউডস আর্কিটেকচার নামের একটি সংস্থা এই বিল্ডিং তৈরির ধারণা দিয়েছে। এরই মধ্যে দুবাই এ ধরনের একটি বিল্ডিং তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়। এখান থেকে বোঝা যায়, আমরা হয়তো ফিতনার কম নিকটে আছি বা ফিতনার যুগেই আছি।

রাসুল (সা.)-এর যে সকল হাদিসে আগত ফিতনাসমূহের কথা বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো মুসলমানদের বিশেষভাবে স্মরণ রাখা উচিত। হজরত মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ লুধিয়ানবী রহ. ‘হাদিসের দৃষ্টিতে বর্তমান যুগ’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। গ্রন্থটিতে তিনি ফিতনার যুগ সম্পর্কিত প্রায় সব হাদিস একত্র করেছেন। তাতে তিনি এমন একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন, যাতে রাসুল (সা.) ফিতনার যুগের বাহাত্তরটি আলামত বলেছেন। হাদিসটি পড়ুন এবং আজকের অবস্থা মিলিয়ে দেখুন। দেখবেন, আজকের অবস্থার সঙ্গে হাদিসের বক্তব্যের কি চমৎকার মিল!

বর্তমান বিশ্বের প্রখ্যাত স্কলার জাস্টিস আল্লামা মুফতি তাকি উসমানি তাঁর একটি লেকচারে বিভিন্ন হাদিসের আলোকে ফিতনার বাহাত্তরটি নিদর্শন উল্লেখ করেন। নিম্নে সেগুলো তুলো ধরা হলো।

হজরত হুজায়ফা (রা.) বলেন, কিয়ামতের আগে বাহাত্তরটি বিষয় প্রকাশ পাবে :

১. লোকেরা নামাজে ডাকাতি করবে। অর্থাৎ নামাজের প্রতি মানুষের একদম গুরুত্ব থাকবে না। এ কথাটি আজকের যুগে এতটা আশ্চর্যের নয়। কারণ এ যুগে বেশির ভাগ মুসলমানের মাঝেই নামাজের গুরুত্ব নেই। রাসুল (সা.) যখন এ কথা বলেছিলেন তখন নামাজ ঈমান এবং কুফুরের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টিকারী বিষয় ছিল। সে যুগে একজন মুসলমান যত খারাপই ছিল না কেন, যত মারাত্মক বদকার ও ফাসেকই ছিল না কেন, তারা কিছুতেই নামাজ ছাড়ত না। সে যুগে রাসুল (সা.) এ কথাটি বলেছিলেন। তখন মানুষ নামাজ ছাড়ার কল্পনাও করতে পারত না। ২. আমানতের খেয়ানত করবে। অর্থাৎ তাদের কাছে আমানতরূপে যা কিছু রাখা হবে তা তারা আত্মসাৎ করবে। ৩. সুদের লেনদেন করবে। ৪. মিথ্যা কথা বলাকে হালাল মনে করবে। অর্থাৎ মিথ্যা বলতে পারাকে একটি দক্ষতা ও যোগ্যতা মনে করা হবে। ৫. সামান্য বিষয়ে রক্তপাত করবে এবং অন্যের প্রাণ সংহার করবে। ৬. উঁচু উঁচু ভবন নির্মাণ করবে। ৭. দীন বিক্রি করে দুনিয়া উপার্জন করবে। ৮. আত্মীয়দের সঙ্গে বাজে আচরণ করবে। ৯. ইনসাফ উঠে যাবে। ১০. মিথ্যা সত্যতে পরিণত হবে। ১১. রেশমি পোশাক পরিধান করা হবে। ১২. জুলুম-অত্যাচার ব্যাপকরূপ লাভ করবে। ১৩. তালাকের আধিক্য হবে। ১৪. আকস্মিক মৃত্যুর হার বেড়ে যাবে। ১৫. দুর্নীতিপরায়ণ লোকদের সেলাক মনে করা হবে। ১৬. সেলাকদের দুর্নীতিপরায়ণ মনে করা হবে। ১৭. মিথ্যাকে সত্য মনে করা হবে। ১৮. সত্যকে মিথ্যা বলা হবে। ১৯. অপবাদ আরোপের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। ২০. বৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও পরিবেশ উষ্ণ থাকবে। ২১. লোকেরা সন্তান লাভের পরিবর্তে সন্তান নেওয়াকে অপছন্দ করবে। অর্থাৎ সন্তান লাভের জন্য মানুষ যেভাবে দোয়া করে তার পরিবর্তে সন্তান না হওয়ার জন্য দোয়া করবে এবং বিভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করবে। যেমন, আজকাল পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে এবং বলা হচ্ছে ‘দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়।’ ২২. নীচ লোকেরা সম্পদশালী হবে এবং অত্যন্ত বিলাসী জীবনযাপন করবে। ২৩. ভদ্রলোকেরা নিগৃহীত হবে। ২৪. রাষ্ট্রপ্রধান, শাসকবর্গ ও মন্ত্রিপরিষদ এবং তাদের সমর্থক ও সহযোগীরা মিথ্যা বলায় অভ্যস্ত হয়ে যাবে এবং সকাল-বিকেল মিথ্যা কথা বলবে। ২৫. আমানতদার ব্যক্তি খেয়ানত করবে। ২৬. নেতৃবর্গ জালেম ও অত্যাচারী হবে। ২৭. আলেম এবং কারি বদকার হবে। অর্থাৎ আলেম এবং পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতকারী লোকজনও বদকার ও ফাসেক হবে। ২৮. লোকেরা জীবজন্তুর চামড়া দ্বারা তৈরি উন্নতমানের পোশাক পরবে। ২৯. কিন্তু তাদের দিলগুলো মৃত জন্তুর চেয়ে বেশি দুর্গন্ধময় হবে। ৩০. এবং পাথরের চেয়ে বেশি কঠিন হবে। ৩১. স্বর্ণ সুলভ হবে। ৩২. রুপার মূল্য বেড়ে যাবে। ৩৩. গুনাহর পরিমাণ বেড়ে যাবে। ৩৪. জানমালের নিরাপত্তা কমে যাবে। ৩৫. কোরআন শরিফকে সজ্জিত করা হবে। ৩৬. মসজিদকে কারুকার্যময় করা হবে। ৩৭. উঁচু উঁচু সৌধ নির্মিত হবে। ৩৮. হৃদয়গুলো উজাড় হবে। ৩৯. ব্যাপকভাবে মদ পান করা হবে। ৪০. শরিয়তের দণ্ডবিধিকে অকার্যকর করা হবে। ৪১. দাসী স্বীয় মুনিবকে জন্ম দিবে। অর্থাৎ মেয়ে মায়ের ওপর কর্তৃত্ব করবে এবং এরূপ ব্যবহার করবে, যেরূপ মুনিব দাসীর সঙ্গে ব্যবহার করে। ৪২. একসময় যারা খালি পায়ে ও উন্মুক্ত দেহে চলাফেরা করত, এরূপ নীচু শ্রেণির লোকেরা দেশের শাসক বনে যাবে। ৪৩. পুরুষ ও মহিলা যৌথভাবে ব্যবসা করবে। মহিলারা জীবনের সকল ক্ষেত্রে পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে। ৪৪. পুরুষরা মহিলাদের বেশভূষা ধারণ করবে। ৪৫. মহিলারা পুরুষদের বেশভূষা ধারণ করবে। দূর থেকে দেখে বোঝা যাবে না, এটা পুরুষ না মহিলা। ৪৬. গায়রুল্লাহর নামে শপথ করা হবে। শপথ শুধু আল্লাহর নামে এবং কোরআনের ওপর বৈধ, অন্য কোনো কিছুর নামে শপথ করা হারাম। কিন্তু ফিতনার যুগে মানুষ আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য জিনিসের নামেও শপথ করবে।

৪৭. মুসলমানরাও নির্দ্বিধায় মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত থাকবে। ৪৮. শুধু পরিচিত লোকদের সালাম দেওয়া হবে। অথচ রাসুল (সা.)-এর শিক্ষা হলো : তুমি যাকে চেন তাকেও সালাম কর এবং যাকে তুমি চেন না তাকেও সালাম কর (বুখারি, হাদিস : ১২)। বিশেষ করে পথ চলার সময় পথে কারো সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তাদের সকলকে সালাম করা উচিত। কিন্তু গমনাগমনকারী লোকদের সংখ্যা অনেক বেশি হলে এবং সালামের কারণে নিজের কাজে সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে তখন সালাম না দেওয়ারও অবকাশ আছে। কিন্তু একটা সময় আসবে যখন গমনাগমনকারীদের সংখ্যা এক-দুজন হলেও সালাম দেওয়া হবে না; সালামের রেওয়াজ একবারেই উঠে যাবে। ৪৯. দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে দ্বিনী ইলম শিক্ষা দেওয়া হবে। শিক্ষা অর্জনকারীদের উদ্দেশ্য হবে এর মাধ্যমে আমাদের ডিগ্রি লাভ করা, চাকরি পাওয়া, পয়সা উপার্জন করা এবং সম্মান ও খ্যাতি অর্জিত হওয়া। ৫০. আখেরাতের কাজের দ্বারা দুনিয়া উপার্জন করা হবে। ৫১. জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় সম্পদকে নিজের সম্পদ মনে করা হবে। ৫২. আমানতের মালকে লুটের মাল মনে করা হবে। ৫৩. জাকাতকে জরিমানা মনে করা হবে। ৫৪. সমাজের সবচেয়ে নীচ ও নিকৃষ্ট ব্যক্তিকে লোকেরা নিজেদের নেতা বানাবে। ৫৫. মানুষ নিজের পিতার অবাধ্যতা করবে। ৫৬. এবং মায়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করবে। ৫৭. বন্ধুদের ক্ষতি করতে দ্বিধা করবে না। ৫৮. স্ত্রীর আনুগত্য করবে। ৫৯. বদকার লোকেরা মসজিদে শোরগোল করবে। ৬০. গায়িকা মহিলাদের সম্মান করা হবে। অর্থাৎ যে মহিলারা গানবাজনার পেশায় থাকবে তাদের সম্মানের চোখে দেখা হবে। ৬১. বাদ্যযন্ত্র এবং বাজনার বিভিন্ন উপকরণকে বিশেষ যত্ন করা হবে। ৬২. মদের দোকান বেড়ে যাবে। ৬৩. জুলুম-অত্যাচার করাকে গর্বের বিষয় মনে করা হবে। ৬৪. আদালতে ন্যায়বিচার বিক্রি হবে। অর্থাৎ বিচারপ্রার্থী ন্যায়ের ওপর হলেও পয়সা দিয়ে রায় নিজের পক্ষে নিতে হবে। ৬৫. পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। ৬৬. পবিত্র কোরআন গানের সুরে তিলাওয়াত করা হবে। কোরআনকে বোঝার জন্য অথবা সাওয়াব লাভের উদ্দেশ্যে কিংবা দাওয়াতের উদ্দেশ্যে তিলাওয়াত করা হবে না। ৬৭. হিংস্র পশুর চামড়া ব্যবহার করা হবে। ৬৮. উম্মতের শেষ যুগের লোকেরা প্রথম যুগের লোকদের ওপর বিভিন্ন অপবাদ আরোপ করবে। তাদের সমালোচনা করবে এবং বলবে, তারা এই এই কথা ভুল বলেছে। আজকের যুগে দেখা যায়, উম্মতের শ্রেষ্ঠ জামাত সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে অনেকে বেয়াদবি করছে। যাঁদের মাধ্যমে আমরা দ্বিন পেয়েছি, তাঁদেরকে বেকুব, মূর্খ ও ধর্মান্ধ বলছে। ৬৯. হয়তো তোমাদের ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে লালবর্ণের তুফান আসবে। ৭০. অথবা ভূমিকম্প আসবে। ৭১. অথবা লোকদের চেহারা বিকৃত হবে। ৭২. অথবা আকাশ থেকে পাথর বর্ষিত হবে। কিংবা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অন্য কোনো আজাব আসবে।

এসব আলামত নিয়ে একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে আমাদের সমাজে প্রতিটি আলামত বিদ্যমান এবং সমাজে বর্তমানে যে অশান্তি বিরাজ করছে তা মূলত ওপরে বর্ণিত বদআমলগুলোরই ফল। আর এ কারণেই আমাদের ওপর বিপদাপদের পাহাড় ভেঙে পড়ছে।

হজরত আলী (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, যখন আমার উম্মতের মাঝে বারোটি (কোনো কোনো বর্ণনায় পনেরোটি) কাজ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে তখন তাদের ওপর মসিবতের পাহাড় ভেঙে পড়বে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ, কাজগুলো কী? উত্তরে রাসুল (সা.) বলেন :

১. যখন রাষ্ট্রীয় সম্পদকে লুটের মাল মনে করা হবে…।  ২. যখন আমানতের মালকে লুটের মাল মনে করা হবে এবং তাতে খেয়ানত করবে। ৩. যখন লোকেরা জাকাতকে জরিমানা এবং ট্যাক্স মনে করবে। ৪. মানুষ স্ত্রীর আনুগত্য করবে এবং মায়ের অবাধ্যতা করবে অর্থাৎ মানুষ স্ত্রীকে খুশি করার জন্য মাকে অসন্তুষ্ট করবে। ৫. মানুষ বন্ধুর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে এবং বাবার সঙ্গে অসদ্ব্যবহার করবে অর্থাৎ বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করবে কিন্তু বাবার সঙ্গে রূঢ় ও কঠোর আচরণ করবে। ৬. মসজিদে শোরগোল হবে। ৭. সমাজের সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও নীচ ব্যক্তিকে নেতা বানানো হবে। ৮. অনিষ্টের ভয়ে মানুষকে সম্মান করা হবে। ৯. ব্যাপকভাবে মদ পান করা হবে। ১০. ব্যাপকভাবে রেশমি কাপড় পরিধান করা হবে। ১১. ঘরে নর্তকী ও গায়িকা রাখা হবে এবং বাদ্যযন্ত্র ও নাচ-গানের উপকরণকে যত্নসহকারে রাখা হবে। ১২. এ উম্মতের পরবর্তী লোকেরা পূর্ববর্তী লোকদের ওপর অভিসম্পাত করবে।

রাসুল (সা.) এ আলামতগুলো বর্ণনা করে বলেন, এ আলামতগুলো যখন মুসলিম সমাজে দেখা দিবে তখন মসিবতের পাহাড় ভেঙে পড়বে। এ আলামতগুলোর বেশির ভাগই আজ আমাদের সমাজে বিদ্যমান। আমাদের সমাজে এমন অনেক বিষয় আছে যা আমাদের জিম্মি করে ফেলেছে। নিম্নে সেগুলোর কয়েকটি তুলে ধলা হলো :

মাদক : বর্তমান যুগে সত্যিই মদকে মদ মনে করা হয় না। বিভিন্ন নাটক-সিনেমায় মদকে অত্যন্ত হালকা করে প্রদর্শন করা হয়। বাবা-ছেলে একসঙ্গে খুব স্বাভাবিকভাবে মদ খাচ্ছে, এমন চিত্র প্রদর্শন করা হয়। বিভিন্ন পার্টিতে এখন মদ রাখা স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে, সারা বছর মদ পান না করলেও কেউ কেউ বিভিন্ন দিবসে পার্টির নামে মদ পান করছে। প্রায় পত্রিকাগুলো খুললে রিপোর্ট পাওয়া যায়, আস্তে আস্তে নারীরাও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। আল্লাহ আমাদের সকলকে এই মহামারি থেকে হেফাজত করুন।

সুদ : সুদ তো আমাদের সমাজে এতটাই ব্যাপক হয়ে গেছে যে মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে—সুদবিহীন অর্থনীতি চিন্তাই করা যায় না। সুদ ব্যবস্থা বন্ধ করতে গেলে অর্থনীতিই ভেঙে পড়বে। অথচ পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, আল্লাহ ব্যবসাকে করেছেন হালাল এবং সুদকে করেছেন হারাম। (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৭৫)

ঘুষ : যখন আমার উম্মত ঘুষকে গিফট ও উপহার বলে হালাল করবে…। কেউ কেউ ঘুষকে বলেন, স্পিড মানি। আজকাল ঘুষদাতা গিফট দিলাম বলে ঘুষ দিচ্ছে এবং ঘুষ গ্রহণকারী গিফট বলেই তা গ্রহণ করছে অথচ এটি ঘুষ। যখন আমার উম্মত জাকাতের মালকে ব্যবসার মাল রূপে গণ্য করবে তখন উম্মতের ওপর ধ্বংস নেমে আসবে। এ চারটি বিষয় আলোচ্য হাদিসে রাসুল (সা.) উল্লেখ করেছেন। এগুলো আজ আমাদের সমাজে দেখা যাচ্ছে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হেফাজত করুন।

লোকজন গাড়িতে আরোহণ করে মসজিদে আসবে

এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ফিতনার যুগে লোকেরা ‘মায়াসির’-এর ওপর আরোহণ করে আসবে এবং মসজিদের দরজায় এসে নামবে। ‘মায়াসির’ আরবি শব্দ। মূল্যবান রেশমি কাপড়কে ‘মায়াসির’ বলা হয়। সে যুগে রাষ্ট্রীয় লোকেরা ঘোড়ার পিঠের গদির ওপর এটি ব্যবহার করত। আগের যুগে এটি কল্পনা করা কঠিন ছিল যে একজন মুসলমান মূল্যবান রেশমি কাপড়ে নির্মিত গদির ওপর আরোহণ করে কিভাবে মসজিদে আসবে? কিন্তু বর্তমানে নানা রকম মোটরগাড়ি আবিষ্কৃত হওয়ায় এটি বোঝা আমাদের জন্য সহজ হয়েছে। এখন লোকেরা দামিদামি গাড়িতে আরোহণ করে মসজিদের দরজায় এসে নামে।

অশ্লীল পোশাক পরা স্বাভাবিক বিষয় হবে

নারীরা পোশাক পরিহিত থাকবে অথচ এর পরও বস্ত্রহীন হবে। আগের যুগে এটি বোঝা অনেক কঠিন ছিল যে পোশাক পরা থেকেও কিভাবে বস্ত্রহীন হয়? কিন্তু আজকে আমরা এটি ঠিকই দেখছি; মেয়েরা এত পাতলা পোশাক পরিধান করে যে দেহের অঙ্গগুলো সবই বাইরে থেকে দেখা যায় কিংবা এত সংক্ষিপ্ত পোশাক পরিধান করে যে দেহের অনেক অঙ্গই উন্মুক্ত থাকে কিংবা পোশাক এতটা টাইট পরিধান করে যে দেহের অঙ্গগুলো ফুটে থাকে।

মহিলাদের চুল হবে উটের কুঁজের ন্যায়

মহিলাদের চুল হবে উটের কুঁজের ন্যায়। রাসুল (সা.) এ ধরনের নারীদের অভিশাপ করেছেন। আগের যুগের আলেমরা এ হাদিসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পেরেশান হতেন যে চুল আবার উটের কুঁজের ন্যায় কিভাবে হয়? কারণ উটের কুঁজ অনেক উঁচু হয়, চুল কিভাবে এত উঁচু হবে? কিন্তু কল্পনাতীত অনেক বিষয়কে আজকের যুগ বাস্তব করে দেখিয়েছে। আজকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় মেয়েরা চুলকে ফুঁলিয়ে উঁচু করে বাঁধে।

অপরাপর সম্প্রদায় মুসলমানদের গ্রাস করবে

সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, খাদ্য গ্রহণকারীরা যেভাবে খাবারের পাত্রের চতুর্দিকে একত্র হয়, অচিরেই বিজাতিরা তোমাদের বিরুদ্ধে সেভাবেই একত্র হবে। এক ব্যক্তি বললেন, সেদিন আমাদের সংখ্যা কম হওয়ার কারণে কি এরূপ হবে? তিনি বললেন, তোমরা বরং সেদিন সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে; কিন্তু তোমরা হবে প্লাবনের স্রোতে ভেসে যাওয়া আবর্জনার মতো। আর আল্লাহ তোমাদের শত্রুদের অন্তর থেকে তোমাদের আতঙ্ক দূর করে দিবেন, তিনি তোমাদের অন্তরে ভীরুতা ভরে দিবেন। এক ব্যক্তি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! ‘আল-ওয়াহ্ন’ কি? তিনি বললেন, দুনিয়ার মোহ এবং মৃত্যুকে অপছন্দ করা। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪২৯৭) বর্তমান পৃথিবীর চিত্র তেমনটাই মনে হচ্ছে।

ফিতনার যুগে মুসলমানের করণীয়

প্রিয় পাঠক! আমরা এখন হয়তো সেই যুগেই পদার্পণ করছি। কোথাও কোনো শান্তি নেই। সবাই পাপের সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছে। অনিয়মই হয়ে যাচ্ছে নিয়ম। ধর্মভীরুতা হয়ে যাচ্ছে আনস্মার্টনেস। কঠিন কবিরা গুনাহের কাজগুলো হয়ে যাচ্ছে প্রগতিশীলতা। সুদ, ঘুষ, চুরি, ডাকাতি, গিবত সবই এখন আমাদের নিত্যদিনের কাজ। এখন আর আমরা গুনাহকে গুনাহ মনে করতেই রাজি নই। (নাউজুবিল্লাহ)। আল্লাহর নাফরমানি করাই হয়ে উঠছে ফ্যাশন। যার কারণ বিশ্বব্যাপী নেমে এসেছে বিপর্যয়। এই বিপর্যয় থেকে বাঁচতে আমাদের আবারও ফিরে যেতে হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর দেখানো পথে।

এখন আর আমাদের অন্যের দোষ তালাশ করার সময় নেই। এখন উচিত নিজেদের সংশোধন করা। গুনাহ থেকে বিরত থাকা। সর্বদা আল্লাহর দরবারে তাওবা-ইসতেগফার করা। সকল ফিতনা থেকে বেঁচে থাকতে মহান আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা। ফিতনা থেকে মুক্ত থাকার জন্য প্রিয় নবী (সা.) স্বীয় উম্মতদের এমন একটি দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন, উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল ফিতানি, মা জহারা মিনহা ওয়া মা বাতানা।’ অর্থ : ‘হে আল্লাহ, আমরা আপনার কাছে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল ফিতনা থেকে পরিত্রাণ চাই।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৭৭৮)

ফিতনা থেকে বাঁচতে আমাদের করণীয় হলো, চোখের গুনাহ, অশ্লীলতা ও উলঙ্গপনা, অন্যকে কষ্ট দেওয়া, অন্যের হক নষ্ট করা, সুদ ও ঘুষের গুনাহ থেকে নিজেকে যথাসাধ্য বাঁচানোর চেষ্টা করতে হবে। এ ধরনের অপরাধের ব্যাপারে সর্বদা নিজ পরিবার-পরিজন ও বন্ধু মহলকে সতর্ক করতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে এই ভয়াবহ ফিতনাগুলো থেকে মুক্ত থাকার তাওফিক দান করুক। আমিন।

আপনার মতামত লিখুন

ধর্ম বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ