শনিবার-২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং-৯ই ফাল্গুন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, সময়: সকাল ৭:০১, English Version
পার্বতীপুরে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পন ভাষা শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা মহান শহীদ দিবস ও মাতৃভাষা দিবসে গাইবান্ধায় দেশসেরা কামেরাবন্দি ওরা দু ভাই স্মৃতির মিনারে লাখো জনতার ঢল আগামীকাল মহান ‘শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ চিরিরবন্দরে জেলা পরিষদ ডাক বাংলো ভবনের উদ্বোধন লালমনিরহাটের প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক হারানো মসজিদের পুন:নির্মাণ

আলেমদের মধ্যে এত মতভেদ কেন

প্রকাশ: শনিবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ , ৪:০৮ অপরাহ্ণ , বিভাগ : ধর্ম,

এমএন২৪.কম ডেস্ক :  মতভেদ মানুষের এক প্রকৃতি। পছন্দ-অপছন্দের দিক থেকে কোনো এক বিষয়ে একাধিক ব্যক্তির মধ্যে দ্বিমত হওয়া স্বাভাবিক। রং, স্বাদ, গন্ধ নিয়ে একেক মানুষের ভালোলাগা একেক রকম। এক চিকিৎসকের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপত্র অন্য চিকিৎসকের সঙ্গে সব সময় মিলে যায় না। এক প্রকৌশলীর প্রকৌশল অন্য প্রকৌশলীর সঙ্গে খাপ খায় না। ইসলামী শরিয়তের বিষয়েও অনুরূপ মতভেদ অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং এটাই প্রকৃতি। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করলে সব মানুষকে এক জাতি করতে পারতেন, কিন্তু তারা পরস্পর মতবিরোধকারী রয়ে গেছে। তবে যাদের তোমার রব দয়া করেছেন, তারা ছাড়া। আর তিনি তাদের এ জন্যই সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ১১৮-১১৯)

তবে মতভেদ যে সব সময় রহমত, তা নয়। হক জানার পর সে বিষয়ে মতভেদ করা নিন্দনীয়। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘কোনো একদিন ভোরে আমি রাসুল (সা.)-এর কাছে এলাম। তিনি বলেন, একবার তিনি কোরআনের একটি আয়াতের ব্যাপারে দুই লোকের মতপার্থক্যের আওয়াজ শুনতে পেয়ে রাসুল (সা.) আমাদের মাঝে এলেন, এ অবস্থায় তাঁর চেহারায় রাগের বহিঃপ্রকাশ হচ্ছিল। তিনি বলেন, তোমাদের পূর্ববর্তীরা একমাত্র আল্লাহর কিতাবে দ্বিমত করার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৬৬৬৯)

ইসলামের বিভিন্ন সূক্ষ্ম মাসআলা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ হয়। ফলে মানুষ হতাশ হয়ে পড়ে। তারা বলে বসে, কোরআন এক হওয়া সত্ত্বেও আলেমদের মধ্যে বিভিন্ন মাসআলায় মতভেদ হয় কেন। আসলে কোরআন ও হাদিস তো সবার সামনেই আছে, কিন্তু তার পরও বিভিন্ন মাসআলায় সাহাবায়ে কেরামের যুগে মতভেদ হয়েছে। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

মানুষের মধ্যে মতভেদ অনেক কারণেই হয়ে থাকে। সেই কারণগুলো সম্পর্কে ধারণা নেওয়া গেলে কারো মনে মতভেদ সম্পর্কে আর এমন প্রশ্ন জাগবে না।

মতভেদের প্রথম কারণ : যিনি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে মতভেদ করছেন তাঁর কাছে সঠিক দলিল পৌঁছেনি। অথবা দলিল পৌঁছেছে, কিন্তু যে পথে পৌঁছেছে তা তাঁর কাছে সন্তোষজনক নয়। মতানৈক্যের এই কারণটি সাহাবাদের পরবর্তীকালের ওলামাদের জন্য নির্দিষ্ট নয়। বরং এটা সাহাবায়ে কেরাম ও তাঁদের মধ্যেও পাওয়া যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বুখারি শরিফের ৫৭২৯ নম্বর হাদিসকে পেশ করা যেতে পারে। আমিরুল মুমিনিন ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) যখন সিরিয়া সফরে বের হলেন, তখন পথিমধ্যে খবর পেলেন, সেখানে প্লেগ রোগ বিস্তার লাভ করেছে। তিনি থেমে গিয়ে সাহাবাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে লাগলেন। (এমতাবস্থায় সিরিয়া প্রবেশ করা উচিত হবে কি না? কারণ এই রোগটি ছিল সংক্রামক) তিনি মুহাজির ও আনসারদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। কিন্তু এই বিষয়ে দুই পক্ষের সিদ্ধান্ত দুই ধরনের। একদল বলল, ফিরে যাওয়া হোক। জেনেশুনে রোগের মুখে পড়া উচিত নয়। অন্যদল বলল, সিরিয়া প্রবেশ করা হোক। কারণ, যা হওয়ার তা হবেই, ভয়ের কিছু নেই। আল্লাহর তাকদির থেকে পালিয়ে যাওয়ার পথ নেই। অথচ এ ক্ষেত্রে তাঁদের ফিরে যাওয়াই যুক্তিযুক্ত ছিল।

বর্ণনাকারী বলেন, এমন সময় আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) এলেন। তিনি এতক্ষণ যাবৎ তাঁর কোনো প্রয়োজনের কারণে অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমার কাছে একটি তথ্য আছে, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, তোমরা যখন কোনো এলাকায় (প্লেগের) বিস্তারের কথা শোনো, তখন সেখানে প্রবেশ কোরো না। আর যদি কোনো এলাকায় এর প্রাদুর্ভাব নেমে আসে, আর তোমরা সেখানে থাকো, তাহলে সেখান থেকে বেরিয়ে যেয়ো না। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) আল্লাহর প্রশংসা করলেন, তারপর প্রত্যাবর্তন করলেন।

মতভেদের দ্বিতীয় কারণ : এমনও হতে পারে যে হাদিস ইমামের কাছে পৌঁছেছে বটে, কিন্তু তিনি তা ভুলে গেছেন। মানুষ হিসেবে ভুল হওয়াই স্বাভাবিক। একবার রাসুল (সা.) ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) ও আম্মার বিন ইয়াসের (রা.)-কে কোথাও পাঠিয়েছিলেন। সফরে ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) ও আম্মার (রা.) উভয়ে (স্বপ্নদোষ হওয়ার ফলে) অপবিত্র হয়ে যান। পবিত্রতার জন্য তাঁদের কাছে পানি ছিল না। আম্মার (রা.) ইজতিহাদ করলেন, পানি যেমন দেহকে পবিত্র করে, তেমনি মাটিও করবে। ফলে তিনি পশুর মাটিতে গড়াগড়ি দেওয়ার মতো গড়াগড়ি দিলেন। কারণ তিনি সারা শরীরে মাটি লাগানো জরুরি মনে করলেন। এবং এভাবে পবিত্রতা অর্জন করে নামাজ আদায় করলেন।

পক্ষান্তরে ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) নামাজই পড়লেন না। অতঃপর তাঁরা উভয়ে রাসুল (সা.)-এর কাছে উপস্থিত হয়ে ঘটনা জানালেন। এবং রাসুল (সা.) তাঁদের তায়াম্মুমের নিয়ম শিখিয়ে দিলেন। কিন্তু অনেক দিন ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) এই ঘটনাটি সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিলেন। এবং বড় নাপাকি থেকে পবিত্রতা অর্জনে তায়াম্মুম যথেষ্ট মনে করতেন না। এ বিষয়ে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-ও তাঁর অনুগামী ছিলেন। সুতরাং এই বিষয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও আবু মুসা (রা.)-এর মধ্যে মতভেদ হয়। আবু মুসা (রা.) হজরত আম্মারের এই ঘটনা তুলে ধরলেন, ইবনে মাসউদ বলেন, দেখো না, ওমর তো আম্মারের কথার সঙ্গে একমত হননি।’ তখন আবু মুসা (রা.) তাঁকে বলেন, আম্মারের কথা ছাড়ো, সুরা মায়েদার তায়াম্মুম সম্পর্কীয় আয়াতের ব্যাপারে তোমার মতামত কী? তখন ইবনে মাসউদ (রা.) চুপ হয়ে গেলেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৫৬৯)

মতভেদের তৃতীয় কারণ : মতানৈক্যের আরেকটি কারণ হলো, ব্যাখ্যার ভিন্নতার কারণে। একই আয়াত বা হাদিসের ব্যাখ্যা একেক জন একেকটি করেছেন। যেমন পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যদি তোমরা অসুস্থ হও, অথবা সফরে থাকো, অথবা তোমাদের মধ্যে কেউ পায়খানা থেকে আসে, অথবা তোমরা স্ত্রী স্পর্শ করো এবং পানি না পাও, তাহলে পবিত্র মাটি অন্বেষণ করো।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৪৩)

এই আয়াতে ‘স্ত্রী স্পর্শ’ কথাটির ব্যাখ্যায় ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ হয়েছে। কেউ কেউ স্পর্শ বলতে সাধারণ স্পর্শ বুঝেছেন। কেই বুঝেছেন, যৌন উত্তেজনাসহ স্পর্শ। কেউ কেউ বুঝেছেন, স্পর্শ বলতে এখানে স্ত্রী সঙ্গম বোঝানো হয়েছে। এই মতটি ছিল ইবনে আব্বাস (রা.)-এর।

বেশির ভাগ ওলামায়ে কেরাম এখানে ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতই গ্রহণ করেছেন। এবং এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে স্ত্রীকে যৌন উত্তেজনা নিয়ে স্পর্শ করলে অজু ভেঙে যায়, আর সঙ্গম করলে গোসল ফরজ হয়ে যায়।

মতভেদের চতুর্থ কারণ : ইমামের কাছে যে হাদিসটি পৌঁছেছে পরবর্তী সময়ে তার হুকুম রহিত হয়ে গেছে। আর রহিতকারী হাদিসটি তিনি জানেন না। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, আমরা প্রথমে এরূপ করতাম (দুই হাত একসঙ্গে মিলিয়ে দুই রানের মাঝখানে রাখতাম)। কিন্তু পরে আমাদের এমনটি করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং রুকুর সময় হাঁটুর ওপর হাত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (তিরমিজি, হাদিস : ২৫৯)

ইবনে মাসউদ (রা.) অনেক দিন পর্যন্ত এই হাদিসটি না জানার কারণে তিনি রুকু করার সময় হাঁটুর মাঝখানেই হাত রাখতেন।তাই ওলামায়ে কেরামের মধ্যে কোনো বিষয়ে মতভেদ দেখলে তাতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। বরং মতভেদপূর্ণ বিষয়বস্তু নিয়ে বিজ্ঞ আলেমদের সঙ্গে পরামর্শ করা যেতে পারে। প্রয়োজনে দেশের নির্ভরযোগ্য ফতোয়া বিভাগগুলোর আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন

ধর্ম বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ