শনিবার-২৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং-১৬ই ফাল্গুন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, সময়: রাত ২:৫১, English Version
ঘুমানোর আগে দুধ খেলে কী উপকার পাবেন তওবা করে ইসলাম গ্রহণ করলেন ২১ কাদিয়ানি (ভিডিও) মুজিববর্ষে ৪০ হাজার তরুণকে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে: পলক পাপিয়া-সম্রাটদের সাম্রাজ্য এবং নানা প্রশ্ন পাপিয়ার মোবাইল কললিস্টে ১১ এমপির নাম ২০৪৬ অফিসার নেবে ৯ ব্যাংক চাঁপাইনবাবগঞ্জে মাদক সেবন করার অপরাধে -১৩জন মাদক সেবনকারী গ্রেপ্তার

পার্বতীপুরের মধ্যপাড়া পাথর খনি

লাভজনক প্রকল্পে নতুন ঠিকাদার নিয়োগে চলছে তেলেসমাতি কারবার

প্রকাশ: রবিবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২০ , ৬:৪৬ অপরাহ্ণ , বিভাগ : রংপুর,সারাদেশ,

সোহেল সানী: দেশের একমাত্র দিনাজপুরের পার্বতীপুরের মধ্যপাড়া পাথর খনি। আগামী ২১ ফেব্রুয়ারি বর্তমান ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জার্মানীয়া-ট্রেষ্ট কনসোর্টিয়ামের চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত নতুন করে পাথর উত্তোলনের জন্য কোনো আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছে, এ ধরনের একটি খনিতে দরপত্রের মাধ্যমে কার্যাদেশ দিতে প্রায় এক বছর সময় লাগে। সেখানে সময় আছে মাত্র ২৪ দিন। মধ্যপাড়া পাথর খনিটি যখন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জিটিসি’র হাতে প্রথমবারের মত লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, তখন এই লাভজনক প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার মুখে পড়তে যাচ্ছে। অন্যদিকে, তাই তারা চুক্তির মেয়াদ ৪৭ মাস বাড়ানোর আবেদন করেছে জিটিসি। এমজিএমসিএল এতে আপত্তি জানায়। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য ঢাকায় আরবিট্রেশন আদালতে মামলা করেছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জার্মানীয়া-ট্রেষ্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি। গত মঙ্গলবার (২১ জানুয়ারী) থেকে এ নিয়ে আরবিট্রেশন আদালতে শুনানি শুরু হয়েছে।
সংশ্নিষ্টরা বলছেন, কয়লা খনির ঠিকাদার পাথর উত্তোলনের দায়িত্ব নিলে খনির কার্যক্রম নিয়ে সংশয় রয়েছে। এছাড়া সিএমসি কনসোর্টিয়ামের বিরুদ্ধে চুক্তির অতিরিক্ত পানিসহ কয়লা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যাতে কয়েকশ’ কোটি টাকার লোকসান হয়েছে সরকারের। চুক্তি অনুযায়ী কোম্পানিটি প্রতি টন কয়লার জন্য প্রতিটন কয়লা ৩৮ ডলারে চুক্তি করলেও বর্তমানে তারা ৯২ ডলারে নিচ্ছে। যেখানে অন্যান্য দেশে কয়লা উৎপাদনের জন্য টনপ্রতি ৩০ ডলারের বেশি নেওয়া হয় না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিটিসি প্রতি টন পাথর তুলতে নেয় ১২ ডলার। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে ইচ্ছাকৃত উৎপাদন বন্ধ রখা ও প্রকল্প এলাকার উন্নয়নকাজ নির্দ্ধারিত সময়ে শেষ না করাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে চীনা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এক্সএমসি-সিএমসি কনসোর্টিয়ামের বিরুদ্ধে। খনির পাথর উত্তোলনের কাজ ডিরেক্ট পারচেজ ম্যাথড (ডিপিএম) বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে কর্মরত সিএমসি-এক্সএমসি কনসোর্টিয়ামকে কার্যাদেশ দেওয়া হ্েচ্ছ। প্রথমিকভাবে অর্ন্তবর্তীকালীন সময়ের জন্য কাজ দেওয়া হবে এবং পরে দেওয়া হবে পুরো দায়িত্ব। চার দলীয় জোট সরকারের আমলে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে বির্তর্কিত ভাবে টেন্ডারে কাজ পাওয়া এক্সএমসি-সিএমসি কনসোর্টিয়ামকে সর্বনি¤œ দরদাতাকে ডিঙ্গিয়ে কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে, বড়পুকুরিয়া কয়লার উপর নির্ভর করে নির্মান করা পাশর্^বর্তী বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুতের দাম ৩ গুন বাড়াতে হয়েছে। উন্নত বিশে^ কোথাও কয়লা উৎপাদনের জন্য কোনো ঠিকাদার টন প্রতি ৩০ ডলারের বেশী নিচ্ছে না। এছাড়া এই কোম্পানীর সময়েই বড়পুকুরিয়ায় ১ লক্ষ ৮৮ হাজার ৬৪৪ টন কয়লা চুরির ঘটনা ঘটেছে। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ঠিকাদার এক্সএমসি-সিএমসি কনসোর্টিয়ামকে পাথর উত্তোলনে তাদের পাথর খনিতে কাজের অভিজ্ঞতাও নেই। কয়লা কোম্পানির ঠিকাদার হিসেবে সিএমসি কনসোর্টিয়ামের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে।
জিটিসি সুত্র জানায়, ২০১৩ সালে করা চুক্তি অনুযায়ী তারা ৬ বছর খনিতে কাজ করার কথা। কিন্তু পাথর খনি কর্তৃপক্ষ (এমজিএমসিএল) এর নানা প্রতিবন্ধকতা, প্রশাসনিক জটিলতা, ড্রয়িং-ডিজাইন অনুমোদন না করা এবং মালামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানীর অনুমতি না দিয়ে ৪৭ মাস কাজ না করিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছিল তাদের। এমনকি তাদের পাওনা পর্যন্ত আটকে রাখা হয়েছিল ৩ বছর। শুনানিতে জিটিসি দাবী করেছে, তারা এমজিএমসিএল এর অনীহার কারনে ৪৭ মাস খনিতে কাজ করতে পারেনি। তাছাড়া তাদের ২৪০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। জিটিসি খনির দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে খনিটিকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে খনি উন্নয়ন ও নতুন স্টোপ নির্মানসহ পাথর উত্তোলনে শতাধিক বিদেশী খনি বিশেষজ্ঞ ৭ শতাধিক খনি শ্রমিক তিন শিফটে কাজ করে যাচ্ছেন। পাথর খনি থেকে দৈনিক গড়ে সাড়ে ৫ হাজার টন পাথর উত্তোলন হচ্ছে যা খনির উৎপাদন ইতিহাসে সর্বোচ্চ নয়া রেকর্ড।
খনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনা ওই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কযলা উত্তোলনের অভিজ্ঞতা থাকলেও তাদের পাথর উত্তোলনের কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। আর বর্তমানে পাথর খনির ঠিকাদার বেলারুশিয়ান প্রতিষ্ঠান জিটিসি’র অধীনে কর্মরত বিদেশী বিশেষজ্ঞদের রয়েছে তাদের দেশে পাথর খনিতে কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা। চলমান খনিতে হুট করে নতুন কোনো কোম্পানীকে অর্ন্তবর্তীকালীন সময়ের জন্য কাজ দেওয়া খুবই বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত হবে। যদি এই মহুর্তে দরপত্র আহবান করতে সময় লাগে কিংবা কোন ভালো কোম্পানী পাওয়া না যায় তাহলে বর্তমান কোম্পানীকেই চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়ে অর্ন্তবর্তীকালীন সময়ের জন্য রাখাটাই নিয়ম। এই নিয়ে যদি কোনো ধরনের অঘটন কিংবা দূর্ঘটনা ঘটে তাহলে এর দায় দায়িত্ব কে নিবে?
প্রায় এক যুগ পর প্রথমমবারের মতো লাভের মুখ দেখেছে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি এমজিএমসিএল। পাথর খনি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে খনি থেকে ১০ লাখ ৬৭ হাজার ৪৯৪ টন পাথর উত্তোলন করা হয়েছে। এ সময়ে বিক্রি হয়েছে সাত লাখ ৩১ হাজার ১৯৪ টন পাথর। এ থেকে মুনাফা হয়েছে ১১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
পেট্রোবাংলার এক রিপোর্টে জানা গেছে, চুক্তি শেষে যদি কোন কোম্পানীকে নিয়োগ দিতে হয় তাহলে আর্ন্তজাতিক দরপত্র আহবান করতে হবে। আর দরপত্র আহবানের আগে যদি অন্তবর্তীকালীন সময়ের জন্য কাউকে নিয়োগ দিতে হয় তাহলে বর্তমান কোম্পানীকেই দিতে হবে। এতে জবাবদিহিতা থাকবে। কোন ক্ষতি হলে জামানতের টাকা থেকে সম্বন্বয় করা যাবে।
পাথর খনির একজন ডিলার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জিটিসি পাথর উত্তোলনে পারদর্শী তার প্রমান দিয়েছে তারা। আগে এই পাথর খনি পাথর শুণ্য ছিল। ছিল ক্রেতা শুন্য। জিটিসি পাথরে ফুল ফুটিয়েছে। এখন পাথরের ক্রেতাদের আগমন শত শত শ্রমিকের পদচারনায় মুখরিত থাকে পাথর খনি এলাকা। শুনছি কয়লা খনির চায়নীজ কোম্পানীকে এই খনির কাজ দেওয়া হচ্ছে। এটি হবে আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত। কারন চায়নাদের অধীনে কয়লা খনিতে কর্মরত শ্রমিকদের ধর্মঘট, কর্মবিরতি লেগেই থাকে। কিন্তু এখানে এই সব নাই। তাছাড়া চায়না তাদের দেশের শ্রমিক দিয়ে কাজ করায়। এতে করে এখানে কর্মরত শত শত শ্রমিক কর্মহারা হয়ে আবার বেকার হয়ে পড়বে। তাই উৎপাদনের দক্ষতার কথা বিচেনা করে জিটিসিতে আবারো খনির দায়িত্ব দেওয়া হলে মধ্যপাড়ার পাথর দেশের মেগা প্রকল্পগুলোতে ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং খনিটি প্রতি বছরেই লাভের মুখ দেখবে বলে খনি এলাকার সচেতন মানুষ মনে করে।
আজ রবিবার সন্ধ্যে ৬টায় এবিষয়ে মধ্যপাড়া গ্রাইনাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড বোর্ড চেয়ারম্যান ও পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এবিএম আবদুল ফাত্তাহ কে বলেন, পেট্রোবাংলার দু’জন পরিচালককে বিষয়টি সুরাহার ব্যাপারে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ঠিকাদার নিয়োগের বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
মধ্যপাড়া গ্রাইনাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এবিএম কামরুজ্জামান বলেন, নতুন ঠিকাদার নিয়োগের বিষয়টি বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

আপনার মতামত লিখুন

রংপুর,সারাদেশ বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ