বুধবার-২২শে জানুয়ারি, ২০২০ ইং-৯ই মাঘ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, সময়: ভোর ৫:১২, English Version
নীলফামারীতে আবারও মৃদু শৈত্যপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত সরকার লবণচাষিদেরকে সুরক্ষা প্রদান করবে নির্বাচন কমিশনের বিধি-বিধান বিএনপি’র জন্য লাভজনক -তথ্যমন্ত্রী সুন্দরগঞ্জে আবিষ্কার ফাউন্ডেশনের কম্বল বিতরণ নীলফামারীতে আজ মিজানুর রহমান আজহারীর তাফসিরুল কুরআন মাহফিলে ১০ লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতির টার্গেট নাচোলে লটারির টিকিট বিক্রির অপরাধে ১৩ কারাদণ্ড। পার্বতীপুরে জোড়া হত্যাকান্ড মামলার পলাতক আসামী গ্রেফতার

আল্লাহুম্মা আমিন’ ধ্বনিতে মুখরিত কহর দরিয়া তীর

প্রকাশ: সোমবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০২০ , ৮:৩১ পূর্বাহ্ণ , বিভাগ : ঢাকা,ধর্ম,সারাদেশ,

এমএন২৪.কম ডেস্ক : টঙ্গীর ‘কহর দরিয়া’ তীরে লাখো মুসলমানের মুহুর্মুহু ‘আল্লাহুম্মা আমিন’ ধ্বনিতে মুখরিত আখেরি মোনাজাতে মহান আল্লাহর কাছে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শান্তি, অগ্রগতি, সমৃদ্ধি, ইহলৌকিক কল্যাণ ও পারলৌকিক মুক্তি এবং দ্বিনের দাওয়াত সারা বিশ্বে পৌঁছে দেওয়ার তৌফিক কামনা করে গতকাল রবিবার তাবলিগ জামাতের ৫৫তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব শেষ হয়েছে। বিশ্বের ৫১টি দেশের প্রায় তিন হাজার প্রতিনিধিসহ আনুমানিক ৩০ লাখ ধর্মপ্রাণ মানুষ প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন। সকাল ১১টা ৮ মিনিট থেকে ১১টা ৪৬ মিনিট পর্যন্ত ৩৮ মিনিট স্থায়ী আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন তাবলিগ জামাতের শীর্ষ মুরব্বি, কাকরাইল মসজিদের খতিব মাওলানা হাফেজ মোহাম্মদ যোবায়ের।

আগামী ১৭ জানুয়ারি শুক্রবার থেকে শুরু হবে বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব। ১৯ জানুয়ারি পরবর্তী আখেরি মোনাজাতে পরিসমাপ্তি ঘটবে তিন দিন করে ছয় দিনের ইজতেমা। ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বেও অংশ নেবেন বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিসহ ৬৪ জেলার মুসল্লিরা।

আখেরি মোনাজাতে অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে গণভবনে বসে টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্র্রচারিত ইজতেমার মোনাজাতে শরিক হন তিনি। ধর্মবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও গণভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গণভবন থেকে মোনাজাতে শরিক হন।

বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে আখেরি মোনাজাতের প্রস্তুতি শুরু হয় ফজরের নামাজের আগে থেকেই। ভোরে তাবলিগ জামাতের শীর্ষ মুরব্বিরা বয়ান মঞ্চে এসে অবস্থান নেন। নামাজের পরপরই শুরু হয় সমাপনী হেদায়েতি বয়ান। এই বয়ানে আগামী দিনের বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করা হয়। নতুন জামাত তৈরি, জামাতের করণীয়, বিভিন্ন এলাকায় জামাত পরিচালনার পদ্ধতি, দাওয়াতের কলাকৌশল, জামাতবদ্ধ মুসল্লিদের সারা দিনের কর্মপদ্ধতি ও মসজিদের আদব সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা করা হয়। হেদায়েতি বয়ানের আগে দেশ-বিদেশে নতুন জামাত প্রেরণ ও যোগদানে ইচ্ছুক মুসল্লিদের তালিকা তৈরি করা হয়। এ ছাড়া প্রতিটি কাফেলার আমির নির্বাচনের বিষয়ে ও আমিরের কর্তব্য সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। মোনাজাতে অংশগ্রহণ : আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে গতকাল ভোররাত থেকেই ইজতেমাস্থল অভিমুখে মানুষের ঢল নামে। এ দিন টঙ্গী-গাজীপুরের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করা হয়। সকাল ৮টার দিকে ইজতেমা ময়দানের আশপাশ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। কনকনে শীত আর ঠাণ্ডা বাতাস উপেক্ষা করে ছয়-সাত কিলোমিটার দূরে বাস, ট্রাক, কার, মাইক্রো, ট্যাক্সি ও অন্যান্য যানবাহন রেখে হেঁটে ধর্মপ্রাণ মানুষ ছুটে আসেন ময়দানের দিকে। আগের রাত থেকে গাজীপুরের চৌরাস্তা থেকে উত্তরা পর্যন্ত মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সবাইকে এ সড়কে হেঁটে আসতে হয়েছে। গতকাল সকালে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিমানবন্দর থেকে টঙ্গী-বোর্ডবাজার-আশুলিয়া সড়ক পর্যন্ত এলাকা মানুষে একাকার হয়ে যায়। ইজতেমা মাঠ বিস্তৃত হয়ে পড়ে গোটা মহাসড়কে। কোথাও একটু জায়গা খালি ছিল না। অলিগলি থেকে শুরু করে বাড়িঘরের ছাদ সর্বত্রই শুধু মানুষ আর মানুষ। তা ছাড়া পাটি, চট, জায়নামাজ, চাদর, পলিথিন, পুরনো খবরের কাগজ বিছিয়ে রাস্তায় বসে মোনাজাতে অংশ নিয়েছেন অগণিত মানুষ। নদীতে প্রতিটি নৌকা-লঞ্চে ছিল মোনাজাতে অংশ নেওয়া মানুষের উপচে পড়া ভিড়। অনেকেই মোবাইল ফোনে মোনাজাতে অংশ নেন দূরে বসে। বিভিন্ন বাড়িঘর ও দোকানপাটে টেলিভিশনের সামনে জড়ো হন অনেকেই।

মোনাজাত শুরু : হেদায়েতি বয়ানের পরপরই দরাজ কণ্ঠে শুরু হয় আখেরি মোনাজাত। বাংলা, আরবি ও উর্দু ভাষার সংমিশ্রণে আখেরি মোনাজাত শুরু হলে মানুষ হাঁটাচলা বন্ধ করে বসে পড়েন। এ সময় পুরো এলাকায় নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। খানিক পর পর শুধু ভেসে আসে ‘আল্লাহুম্মা আমিন-আল্লাহুম্মা আমিন’ ধ্বনি। অনুতপ্ত মানুষের করুণ কান্নার আওয়াজে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। কান্নার রোল ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়। ‘ইয়া আল্লাহ…ইয়া আল্লাহ’ উচ্চারিত হয় পুরো ময়দান থেকে।

মোনাজাতে অংশ নিতে আসে সব বয়সী মানুষ। বহু নারী ও শিশু বিভিন্ন স্থানে জড়ো হয়ে মোনাজাতে শরিক হন।

মোনাজাতের পর : মোনাজাতের পর শুরু হয় ঘরে ফেরার পালা। ইজতেমা ময়দান থেকে যেসব মুসল্লি চিল্লায় না গিয়ে সরাসরি বাড়ি ফিরে যাবেন, তাঁরা মোনাজাতের পর রওনা হন। যাঁরা নতুন চিল্লায় নাম লিখিয়েছেন, তাঁরা নির্ধারিত জামাতের সঙ্গে সোমবার রওনা হবেন। আন্তর্জাতিক নিবাস থেকে বিদেশি মেহমানদের বিমানবন্দর ও কাকরাইল মসজিদে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ জন্য আয়োজকরা বিশেষ যানবাহন সার্ভিসের ব্যবস্থা করেছেন।

মোনাজাতের পর ইজতেমা ময়দানের চারদিকে বাড়ি ফেরা মানুষের ঢল নামে। স্টেশন রোড থেকে উত্তরে ময়মনসিংহ মহাসড়ক, পূর্বে কালীগঞ্জ সড়ক, দক্ষিণে রাজধানী ঢাকা ও পশ্চিমে আশুলিয়া সড়কে শুধু মানুষ আর মানুষ। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা রিজার্ভ বাস ছাড়া অন্য বাস দরজা বন্ধ করে ভাড়া হাঁকে দুই-তিন গুণ বেশি। পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকায় দূর গন্তব্যের মুসল্লিরা কাঁধে মালামাল-বিছানাপত্র নিয়ে হাঁটতে থাকেন। ট্রাক, পিক আপ, টেম্পো, ইজিবাইক, সিএনজি ট্যাক্সি ও কিছু ছোট যানবাহন টঙ্গী থেকে অতিরিক্ত ভাড়ায় চলাচল করে। প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে বিকেল পর্যন্ত পুরো মহাসড়ক যেন থমকে ছিল। তীব্র যানজটে আটকা পড়ে যানবাহনগুলো। থেমে থেমে গাড়ি চলে রাত পর্যন্ত।

টঙ্গী রেলস্টেশনে ২৮টি অতিরিক্ত ট্রেনের মাধ্যমে ইজতেমা ফেরত মুসল্লিদের গন্তব্যে পৌঁছার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।  মোনাজাতের পর স্টেশনে অধিকসংখ্যক যাত্রীর আগমন ঘটার কারণে হিমশিম খেতে হয়েছে রেল কর্তৃপক্ষকে। ট্রেনের ইঞ্জিন, ছাদ, জয়েন্ট কোথাও জায়গা ছিল না একটু দাঁড়ানোর। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ ট্রেনের ওপর এমনি ঠাঁই নিয়েছে যে ট্রেন আড়াল হয়ে গেছে মানুষের ভিড়ে। নদীতে ও একই চিত্র। টঙ্গী বাজার থেকে মিরপুর ও উলুখোলাগামী লঞ্চ ও নৌকায় ছিল উপচে পড়া ভিড়।

আরো চার মুসল্লির মৃত্যু : রবিবার বার্ধক্যজনিত কারণে ইজতেমা ময়দানে তিনজন মুসল্লি এবং সড়ক দুর্ঘটনায় এক মাদরাসাছাত্র টঙ্গীর কলেজগেট এলাকায় মারা যান। বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেছেন নূর ইসলাম (৬০) দুলদিয়া বাজার, কটিয়াদি, কিশোরগঞ্জ; আলী আহমেদ (৬২) করাতিপাড়া, টেকনাফ, কক্সবাজার; আব্দুল মোমিন (৫৬) হাটখোলা, পাঁচবিবি, জয়পুরহাট। আর গাজীপুরের গাছা এলাকার হযরত আব্দুল কাদের জিলানী নুরিয়া হাফিজিয়া মাদরাসার ছাত্র মাজহারুল ইসলাম (১৬) ইজতেমা মাঠে আসার সময় কলেজগেট এলাকায় বাসের জানালা দিয়ে বমি করছিল। এ সময় পেছন থেকে অনাবিল পরিবহনের একটি বাস তাকে বহনকারী বাসটি ঘেঁষে যাওয়ার সময় ছাত্রটির মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে সে মারা যায়।

সড়কজুড়ে বাজার : গতকাল ভোর থেকে টঙ্গীর প্রায় সব রাস্তা পরিণত হয় বাজারে। এমন কিছু নেই যা পাওয়া যায়নি বাজারে। ইজতেমা ফেরত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য দোকানিরা উঁচু গলায় চিৎকার করতে থাকেন ‘হাফ রেট-হাফ রেট’ বলে। কম্বল, সোয়েটার, কোট-টাই, শাড়ি, লুঙ্গি, মাছ-মাংস, ডিম, সবজি, গুড়-মুড়ি, আপেল-কমলা থেকে শুরু করে চীনামাটির তৈজসপত্র, হাঁড়িপাতিল, এমনকি মোবাইল ফোন পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। বাজারে সব কিছুর দাম কম—এ খবরে ছুটে আসতে দেখা গেছে দল বেঁধে নারীদের।

পরিচ্ছন্ন অভিযান : গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সহ-প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মমর্তা আরিফুর রহমান জানান, দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমার জন্য ময়দান প্রস্তুতি সোমবার সকাল থেকে শুরু হবে। পুরো ময়দানের আবর্জনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওজুখানা, গোসলখানা ও টয়লেটগুলো পরিষ্কার করতে কর্মীরা প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক নিবাসে বিদেশি মেহমানদের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র পরিষ্কার করে তা সংরক্ষণ করতে বেশ কটি জামাত কাজ শুরু করেছেন।

ব্যবস্থাপনায় সন্তোষ প্রকাশ : ইজতেমার মিডিয়া বিষয়ক সমন্বয়কারী মুফতি জহির ইবনে মুসলিম বলেছেন, ইজতেমার সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল প্রশংসনীয়। সরকার ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সার্বক্ষণিক সম্পৃক্ততা ও আন্তরিকতা আমাদের অভিভূত করেছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র জাহাঙ্গীর আলম, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আনোয়ার হোসেনের প্রতি ইজতেমা কর্তৃপক্ষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে।

আগামী ইজতেমা : বিশ্ব ইজতেমার আখেরি মোনাজাতের প্রাক্কালে শীর্ষ মুরব্বিরা আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আগামী বছর বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব অনুষ্ঠিত হবে ৮ জানুয়ারি শুক্রবার থেকে।

আপনার মতামত লিখুন

ঢাকা,ধর্ম,সারাদেশ বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ