মঙ্গলবার-১২ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং-২৭শে কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, সময়: বিকাল ৪:১৪
পার্বতীপুরে চ্যানেল এস প্রতিনিধির পিতা ইন্তেকাল ফুলবাড়ীতে আইন শৃঙ্খলা বিষয়ে আলোচনা সভা॥ মোঃ আফজাল হোসেন দিনাজপুর প্রতিনিধি তিশাকে নিয়ে পালালেন নিশো! অধিনায়ক রিয়াদকে প্রশংসায় ভাসালেন মাশরাফি পীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য হলেন জয় রেল চালকদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন : প্রধানমন্ত্রী ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়েই চলছে :: হবিগঞ্জের ৯ জন

সবজির নার্সারী ব্যবসায় গ্রামের কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তন

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৯ , ৯:০৪ অপরাহ্ণ , বিভাগ : কৃষি,

এমএন২৪.কম ডেস্ক:  বিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বালিয়াড়ী গ্রামের লোকজনের প্রধান পেশা কৃষি। যখন সনাতন কৃষিতে জীবিকা নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়ছিল তখন ২০ বছর পূর্বে ওই গ্রামের কৃষকরা বিকল্প কর্মসংস্থানের আশায় শুরু করেন সবজির নার্সারী ব্যবসা। আর এতে করেই সেখানকার কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে। সবজির চারা বিক্রি করে এখন অনেকেই হয়েছেন স্বাবলম্ভি। এখন ওই গ্রামে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে সাদা পলিথিনে ঢাকা বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে শুধু নার্সারী আর নার্সারী।

বালিয়াড়ী গ্রামের আব্দুল আলী নামে এক কৃষক ৪২ বছর পূর্বে ৩৬ শতক জমিতে সবজির নার্সারী করার কাজ শুরু করেছিলেন। প্রথম দিকে তিনি সফলতা না পেলেও একাধিকবার চেষ্টার পর এক সময় তিনি সবজির চারা উৎপাদনে সফল হন। এখন এলাকার চাহিদা মিঠানোর পর অন্যান্য জেলা থেকেও লোকজন চারা ক্রয় করতে তার সবজির নার্সারীতে আসেন। এখানকার চারা কৃষকের কাছে জনপ্রিয় হওয়ায় বাজারে নিয়ে তার চারা বিক্রি করতে হয় না। কৃষকরাই সরাসরি তার সবজির নার্সারীতে চলে আসেন। অনেকেই আবার আগাম অর্ডার দিয়ে যান নার্সারী মালিক আব্দুল আলীকে।

আব্দুল আলী বলেন, শুরুতে অনেক মাইর খাইছি। তারপরও চেষ্টা চালিয়ে যাই। পরে আমি সফল হই। আমার নার্সারীর চারা নিজের ৭ বিঘা জমিতে ব্যবহার করার পাশাপাশি বিক্রি করি। আমার পরে আরও অনেকেই নার্সারী করেছেন। এখন বালিয়াড়ী গ্রামে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে শুধু নার্সারী আর নার্সারী।

তিনি আরো বলেন, আমার স্ত্রী সন্তানসহ পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৮। এই নার্সারী আর সবজি আবাদ করেই আমার বাচ্ছাদের লেখাপড়া এবং সংসারের ব্যয় নির্বাহ করি। এই ব্যয়ের পরও বছরে আমার ২/৩ লাখ টাকা সঞ্চয় হয়।

গ্রামের যুবক নবিউর রহমান পেশায় একজন রাজমিস্ত্রী। অতিরিক্ত আয়ের আশায় আধা বিঘা জমি বর্গা নিয়ে শুরু করেন নার্সারী ব্যবসা। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিজেদের শ্রমে গড়ে তোলা নার্সারী থেকে বছরে দেড়-দুই লাখ টাকা আয় করেন তিনি।

নবিউর রহমান জানান, তিনি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় একটি নার্সারী থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এই কাজ শুরু করেছেন। নার্সারী তৈরির জন্য জৈবিক সার ব্যবহার করেন তিনি। কুমিল্লা ও শ্রীমঙ্গলসহ বিভিন্ন স্থান থেকে উন্নতমানের বীজ এনে চারা উৎপাদন করেন তিনি। একটি নার্সারীতে পলিথিনের চাউনি তৈরি করে সেখানে রৌদ্র এবং বৃষ্টির ভারসাম্য রক্ষা করে নার্সারী করতে হয়। মায়েরা যেমন নবজাতকদের অনেক যত্ম করে লালন পালন করেন। ঠিক তেমনিভাবে বীজতলা তৈরি করতে আগাছা পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে মাটিতে জৈব সার মিশিয়ে বীজ রোপন করে পলিথিন, বাঁশ, ও বেত দিয়ে সেট তৈরি করে। যা অতি বৃষ্টি ও রোদ থেকে রক্ষা পেতে সহায়তা করে।

তিনি জানান, আমরা ভাদ্র মাসে নার্সারীর কাজ শুরু করি আর জৈষ্ট্য মাসে গিয়ে মৌসুম শেষ হয়। এক মৌসুমে সবজির চারা চার দফা উৎপাদন করা হয়। প্রথম দফায় আগাম সবজির চারা উৎপাদন করা হয়। এতে লাভ পাওয়া যায় বেশী। বালিয়াড়ী গ্রামে ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, শালগম, টমেটো, বেগুন, মরিচ,লাউ পেঁপেসহ বিভিন্ন জাতের সবজির চারা উৎপাদন করা হয়। আবার এগুলোর মাঝে বিভিন্ন জাত রয়েছে। যেমন- ৬ প্রকার টমেটো, ৮ প্রকার মরিচ, ৪ প্রকার ফুলকপি, ৪ প্রকার লাউ আছে।

তিনি আরো জানান, কপির চারা ১ হাজার টাকায় এক হাজার, টমেটো দেড় হাজার থেকে ১৬শ টাকা হাজার বিক্রি হয়। এক হাজার টমেটো চারা উৎপাদন ব্যয় ৭শ থেকে ৮শ টাকা। তবে দাম উঠানামাও করে থাকে। আর বন্যা না হলে এখানে ক্ষতির সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

বালিয়াড়ী গ্রামের বিলাল মিয়া ১২ বছর পূর্বে ১ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে শুরু করেন নার্সারী ব্যবসা। তিনি বলেন, এই নার্সারী আমার জীবনের সাথে মিশে গেছে। দিন রাত আমি এটি নিয়েই চিন্তা করি। তবে পুঁজির অভাবে নার্সারী আরও বড় করতে পারেন না। সরকারিভাবে বীজ ও সার দিয়ে সহায়তা করলে এবং সহজ শর্তে ঋণ পেলে তিনি আরও বড় নার্সারী করতে পারতেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। কোন সহায়তা না পেলেও ওষুধ কোম্পানি
প্যাডসহ বিভিন্ন উপহার দেয়। তবে আমরা জৈবসার ব্যবহার করি এবং যথাসম্ভব কীটনাশক ব্যবহার কম করি।

তিনি আরো বলেন, বালিয়াড়ী গ্রামের অধিকাংশ নার্সারীর মালিক জমি বর্গা নিয়ে কাজ করেন। এর জন্য প্রতি বিঘায় জমির মালিককে বছরে ২০ মন ধান দিতে হয়। আর এখানে শ্রমিক হিসাবে যারা কাজ করেন তাদের দৈনিক মজুরী ৪০০ টাকা। গ্রামের নার্সারীগুলোতে ৫০/৬০জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে বলে জানান তিনি।

ভাই ভাই নার্সারীর মালিক মো. শাহীন মিয়া জানান, হবিগঞ্জ জেলার সকল উপজেলার পাশাপাশি ঢাকা,সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকার লোকজন এখানে এসে চারা সংগ্রহ করে। কৃষকদের পাশাপাশি অনেকেই বাসা-বাড়ীতে টবে লাগানোর জন্য এখানে আসেন চারা সংগ্রহ করার জন্য। বালিয়াড়ী গ্রামে আসলে যে কোন ধরনের সবজির চারা কোন না কোন নার্সারীতে পাওয়া যাবে। জেলার আর কোথাও সব্জির নার্সারী ছিল না। এখন শায়েস্তাগঞ্জ, মীরপুর ও চুনারুঘাট উপজেলার সুন্দরপুর গ্রামে কয়েকটি নার্সারী হয়েছে। তিনি এই ব্যবসার জন্য সরকারী সহায়তা কামনা করেন।

এ ব্যাপারে চুনারুঘাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জালাল উদ্দিন সরকার, সবজির নার্সারী লাভজনক ব্যবসা। যারা এ ধরনের নার্সারী করেছে আমরা তাদের সাথে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ করি। বিভিন্ন প্রযুক্তি নিয়ে পরামর্শ দেই। নতুন নতুন জাত ও আগাম সব্জির চারা উৎপাদনে পরামর্শ দিয়ে থাকি। তাদের তালিকা আমাদের কাছে আছে। আমরা বিভিন্ন প্রশিক্ষনেও তাদেরকে সুযোগ দেই। ভবিষ্যতেও এই সহায়তা অব্যাহত থাকবে।

আপনার মতামত লিখুন

কৃষি বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ