শুক্রবার-২৪শে মে, ২০১৯ ইং-১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, সময়: ভোর ৫:৪৯
মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বাড়ছে দিনাজপুর রাজবাটি আদর্শ মানব কল্যান সংঘের গ্রাহক সমাবেশ ও ইফতার অনুষ্ঠিত শুল্ক বৃদ্ধির ফলে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে চাল আমদানি বন্ধ মোদিকে অভিনন্দন শেখ হাসিনার অবশেষে কাল হচ্ছে প্রথম ধাপের প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাস উদ্বোধনে উত্তরের ঈদযাত্রা নিরাপদ হবে : সেতুমন্ত্রী মাদকসহ কারারী ও জেল সুপারের ড্রাইভার আটক

সুদহারের ব্যবধান বেশি ৫ কারণে

3 weeks ago , বিভাগ : অর্থনীতি,

মুক্তিনিউজ২৪.কম ডেস্ক:দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বেশি। এর নেপথ্যে পাঁচটি কারণকে দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা। কারণগুলো হলো খেলাপি ঋণের আধিক্য, সঞ্চয়পত্রের সুদহার বাজারভিত্তিক না হওয়া, অসহনীয় মূল্যস্ফীতি, উচ্চ পরিচালন ব্যয় ও অতি মুনাফার প্রবণতা। এসব কারণে ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না এবং সুদহারের বৈষম্য বেশি হচ্ছে বলে মত তাঁদের।

ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের যে হারে সুদ বা মুনাফা দেয় এবং ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে যে হারে সুদ নেয় এ দুই হারের পার্থক্যই হলো স্প্রেড। সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী, ক্রেডিট ও ভোক্তাঋণ বাদে অন্য সব খাতে ব্যাংকের ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান ৪ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। সম্প্রতি ভোক্তা অধিকার নিয়ে এক সেমিনারে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি ব্যাংকগুলোর স্প্রেড ৫ শতাংশের বেশি হওয়াকে ডাকাতি বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী এই স্প্রেড ২ থেকে ৩ শতাংশের

মধ্যে থাকে। বাংলাদেশ একমাত্র দেশ, যেখানে স্প্রেড ৫ শতাংশের বেশি। এটা রীতিমতো ডাকাতি বলা চলে।’ তিনি আরো বলেন, আমানতের বিপরীতে ব্যাংক কত সুদ দিচ্ছে আর ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে কত হারে সুদ নিচ্ছে, তা একটা পদ্ধতির মধ্যে আনা দরকার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের মূল্যস্ফীতির হার বেশি। নন-পারফরমিং লোনও (এনপিএল) অনেক হাই। ব্যাংকের পরিচালন ব্যয়ও অনেক বেশি। অনেক ব্যাংক বাহুল্য খরচ করে। উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতায় বড় অঙ্কের অর্থ খরচ হয়। অফিসের সাজসজ্জা ও বিভিন্ন প্রকাশনায় অহেতুক অর্থ খরচ করা হয়। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে অতি মুনাফা করার প্রবণতা কাজ করে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্যক্তিপর্যায়ে আমানত সংগ্রহ ব্যয় বেশি। এ ছাড়া আমানতের চেয়ে সঞ্চয়পত্রের সুদহারও বেশি। অফিস ভাড়া ও কর্মকর্তাদের পেছনেও বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করতে হয়। এসব কারণে তহবিল ব্যয় ও পরিচালন ব্যয় বেশি হয়। তবে এখন ব্যাংকগুলো কম সুদে সরকারি আমানতও পাচ্ছে। এতে ব্যাংকের স্প্রেড কমে আসছে।

এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অনেক দেশের তুলনায় আমাদের স্প্রেড এখনো বেশি। আবার স্প্রেডের বিদ্যমান যে হার সেটিও মানছে না অনেকেই। এতে ঋণের সুদহারও এক অঙ্কে নামছে না।’

খেলাপি ঋণের আধিক্য : দেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে অবলোপনসহ প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় এক লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে অবলোপন ঋণ ৪০ হাজার ১০১ কোটি টাকা এবং এখনো অবলোপন করা হয়নি; কিন্তু মন্দমানে পরিণত হয়েছে ৮০ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মে মন্দ ও অবলোপন করা ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করা আবশ্যক। এ ছাড়া সন্দেহজনক ও নিম্নমানের খেলাপি ঋণের বিপরীতে যথাক্রমে ৫০ ও ২০ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণের নিয়ম রয়েছে। সেই হিসাবে এক লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে ব্যাংকের প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকাই আটকে রয়েছে।

অতি মুনাফার প্রবণতা : ব্যাংকের মধ্যে অতি মুনাফা করার প্রবণতা কাজ করে। কারণ ব্যাংকের মুনাফা কমে গেলে শেয়ারহোল্ডাররা লভ্যাংশ কম পায়। আর লভ্যাংশ কম দিলে ব্যাংকের ইমেজ (ভাবমূর্তি) সংকটে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে আগের বছরের চেয়ে পরের বছর মুনাফা বেশি করার প্রবণতা প্রায় সব ব্যাংকের মধ্যেই থাকে। এতে বেড়ে যায় ঋণের সুদহার।

মূল্যস্ফীতি : মূল্যস্ফীতির চেয়ে আমানতের সুদহার কম হলে মানুষ সঞ্চয়ে নিরুৎসাহ হয়। আবার যাদের সঞ্চয় থাকে তারাও বেশি সুদের আশায় বিকল্প উেস টাকা খাটায়। মার্চে মাসভিত্তিক সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৫.৫৫ শতাংশ। এর অর্থ এক বছর আগে যে পণ্য কিনতে ১০০ টাকা লাগত, মার্চ মাসে একই পণ্য কিনতে ১০৫ টাকা ৫৫ পয়সা লেগেছে। আয় না বাড়লে এ পরিমাণ মূল্যের পণ্য কম কিনতে হবে ভোক্তাদের।

আমানতের চেয়ে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা বেশি : দীর্ঘদিন ধরেই আমানতের চেয়ে সঞ্চয়পত্রের সুদহার অনেক বেশি। বর্তমানে এ খাতের বিভিন্ন সঞ্চয় প্রকল্পে বিনিয়োগের বিপরীতে ১১.৪ থেকে ১১.৭৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিচ্ছে সরকার। ব্যাংকারদের মতে, সঞ্চয়পত্রের বাজারদর নির্ধারণ না হওয়ায় তাঁদের আমানত সংগ্রহের ব্যয় তুলনামূলক বেশি হচ্ছে। তবে সঞ্চয়পত্রের সুদহার বেশি হওয়ার জন্য ব্যাংকের তহবিল সংগ্রহের খরচ বেশি হয়-এ বক্তব্য ঠিক নয় বলে মনে করেন ড. সালেহউদ্দিন।

উচ্চ পরিচালন ব্যয় : বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় বেশি। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে ব্যাংকগুলোর মোট ব্যয় ছিল ৭২ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। ওই সময় মোট আয় ছিল ৯৭ হাজার ৮৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ আয়ের বিপরীতে ব্যয়ের হার ছিল ৭৪.৩৬ শতাংশ।

সার্কভুক্ত দেশগুলোর ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ছয় বছরের স্প্রেড নিয়ে ২০১৬ সালের শেষভাগে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৫ সালে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন ৩.৬৩ শতাংশ স্প্রেড ছিল ভারতে। আর সর্বোচ্চ ৯.৮০ শতাংশ স্প্রেড ছিল ভুটানে। বাংলাদেশে স্প্রেড ছিল ৪.৮৫ শতাংশ। এ ছাড়া মালদ্বীপে ৭ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ৪.৮০ শতাংশ ছিল স্প্রেড। অন্যদিকে বিভিন্ন দেশের স্প্রেড নিয়ে ২০১৭ সালের তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংকের তৈরি এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, অনেক দেশেই ৩ শতাংশের নিচে ছিল স্প্রেড। দেশগুলোর মধ্যে আছে শ্রীলঙ্কা, চীন, ভিয়েতনাম, কাতার, ওমান, নিউজিল্যান্ড, মালয়েশিয়া, লেবানন, কোরিয়া রিপাবলিক, জাপান, কানাডা, বেলারুশ, ইসরায়েল, হাঙ্গেরি, ভানুয়াতু, সুইজারল্যান্ড, সান মারিনো, জর্জিয়া ও ফিজি। এ ছাড়া আট থেকে ১০টি দেশে স্প্রেড হার নেতিবাচক পর্যায়ে ছিল। আবার বেশ কয়েকটি দেশে স্প্রেড ছিল ১০ শতাংশের ওপরে।সূত্র: কালের কন্ঠ

আপনার মতামত লিখুন

অর্থনীতি বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ