মঙ্গলবার-২৩শে জুলাই, ২০১৯ ইং-৮ই শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, সময়: রাত ৮:২৪
ছেলে ধরা আতংক গুজব থেকে সচেতনতা বাড়াতে শহর জুড়ে পুলিশের মাইকিং।। লালপুরে ওয়ালিয়া তরুণ সমাজের ৪র্থ প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালিত বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির দুর্নীতির দায়ে দুদুকের চার্জশিট দাখিল ॥ ডোমারে আরসিসি রাস্তা নির্মানের দাবীতে মানববন্ধন। কলাপাড়ায় পুকুরে ডুবে দুই ভাই-বোনের মৃত্যু।। গোবিন্দগঞ্জে বাঁধ ভেঙ্গে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত শৈলকুপায় গৃহবধূর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার!

বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য টেংরাগিরি

মনির হোসেন, টেংরাগিরি(কুয়াকাটা)থেকে ফিরে ॥ সাগর কন্যা কুয়াকাটার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হননি এমন ভ্রমণ প্রেমী হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবেনা। আর এই কুয়াকাটার এক অনবদ্য সৌন্দর্যের নাম টেংরাগিরি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। স্থানীয়ভাবে যাকে সবাই ফাতরার চর নামেই চেনেন। কোলাহল মুক্ত নির্জন এই চরটির অনাবিল রূপ চোখে লেগে থাকবে আপনার বহুকাল। কুয়াকাটা ভ্রমণে গেলে তাই এই চরে আপনাকে যেতেই হবে।
বঙ্গোপসাগরের কোলে গড়ে ওঠা এই বনে এসে কান পেতে শোনা যায় সাগরের গর্জন। সাগর থেকে উঠে আসা বাতাসে ছন্দময় করে তোলে বনের পত্রগুচ্ছ। বরগুনার তালতলী উপজেলার ফকিরহাটে অবস্থিত টেংরাগিরি একসময় সুন্দরবনের অংশ ছিলো। প্রাকৃতিক এই বনকে স্থানীয় লোকজন ‘ফাতরা বন’ কিংবা ‘ফাতরার চর’ হিসেবে চেনেন। সুন্দরবনের পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্বাসমূলীয় টেংরাগিরি বনাঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে ১৯৬৭ সালে।
তালতলী থেকে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা পর্যন্ত বিস্তৃত এই বনের আয়তন ১৩ হাজার ৬৪৪ একর। ২০১০ সালের ২৪ অক্টোবর চার হাজার ৪৮ দশমিক ৫৮ হেক্টর জমি নিয়ে গঠিত হয় টেংরাগিরি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। এই বনাঞ্চলের তিন দিকে বঙ্গোপসাগর। একপাশে রয়েছে সু-বিশাল খাল। এ খালের একেক অংশকে একেক নামে নামকরণ করা হয়েছে। বান্দ্রা খাল, মেরজে আলীর খাল, সিলভারতলীর খাল, ফেচুয়ার খাল, গৌয়ম তলার খাল, কেন্দুয়ার খাল, সুদিরের খাল, বগীরদোন খাল নামেই সু-বিশাল ওই খালের নামকরণ।
বনাঞ্চলের সখিনা বিটে ২০১১ সালে ইকোপার্ক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ‘দ্বিতীয় সুন্দরবন’ হিসেবে পরিচিতি সংরতি ম্যানগ্রোভ বন সমুদ্র সৈকতের পশ্চিম দিকের টেংরাগিরি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে রয়েছে-চিত্রা হরিণ, বন্য শুকর, চিতাবাঘ, অজগর, কুমির, বানর, শজারু, বানর, বন বিড়াল, বন মোরগ, কচ্ছপ, শৃগাল, ডোরাকাটা বাঘসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী ও হাজার প্রজাতির জীবজন্তুর পাশাপাশি হরেক প্রজাতির পাখির দেখা মেলে বনাঞ্চলের ঘণ গহিন অরণ্যে। এখানে রয়েছে গুঁইসাপসহ বিভিন্ন প্রকার সাপ। সুন্দরবনের খুব কাছে হলেও এ বনে বেশ কিছু ডোরাকাটা বাঘ ছাড়া এখনও বড় ধরনের কোন বাঘের দেখা মেলেনি।
সারি সারি গেওয়া, জাম, ধুন্দল, কেওড়া, সুন্দরী, বাইন, করমচা, বলই কেওয়া, তাল, কাঁকড়া, হেতাল, তাম্বুলকাটা গাছের মধ্যে ঘুরে বেড়ায় কাঠবিড়ালী। তালতলীর ২৩টি পল্লীতে বসবাস করছেন কয়েকশ’ বছরের পুরোনো রাখাইন সম্প্রদায়। তাদের বৈচিত্রপূর্ণ জীবন, প্রাচীন উপাসনালয়, বুদ্ধমূর্তিগুলো পর্যটকদের ভিন্ন মাত্রার আনন্দ দেয়।
পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া থানার অন্তর্গত বঙ্গোপসাগর ও বরগুনার তালতলী উপজেলার বুকে জেগে ওঠা সুন্দরবনের একটি অংশই হচ্ছে টেংরাগিরি বনাঞ্চল বা ফাতরার চর। সুন্দরবনের বর্ধিত অংশ এই চরটি কুয়াকাটার পশ্চিমে অবস্থিত। এটিও একটি ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। দিনে দুইবার এটি জোয়ার-ভাটায় প্লাবিত হয়। সমুদ্রের গর্জন আর বনের নিস্তব্ধতার মাঝে বিস্তীর্ণ বালুচর যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে সৌন্দর্য প্রেমীদের। দিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্রের বুকে চলার কিছুণ পরই আপনার চোখে পড়বে সাগরের বুকে জেগে ওঠা ফাতরার চরের বনভূমি। এ যেন সাগরের বুকে ভাসমান কোনো অরণ্য।
ফাতরার বনকে ১৯৬০ সালে বাংলাদেশ বন বিভাগ সংরতি বনাঞ্চল ঘোষণা করেছে। ১৯৬৭ সালে যার নামকরণ হয় টেংরাগিরি বনাঞ্চল নামে। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এই বন বিভিন্ন গাছপালায় সমৃদ্ধ। কেওড়া, গরাণ, গেওয়া, ওড়া প্রভৃতি শ্বাসমূলীয় গাছ হচ্ছে এই বনের প্রধান গাছ। এছাড়া টেংরাগিরি বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য শকুনের জন্য নিরাপদ বলে ঘোষিত।
কুয়াকাটা থেকে সি-বোর্ড কিংবা ট্রলারে চেঁপে যখনই আপনি ফাতরার চরের খালে প্রবেশ করবেন তখনই আপনাকে স্বাগত জানাবে দু’পাশের ঘণ সবুজ অরণ্য। ট্রলারের জেটি পেরিয়ে আপনি চরের ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়বে শান-বাঁধানো একটি পুকুর ও বন বিভাগের নির্মিত ছোট্ট একটি রেস্ট হাউস। মূলত এই পুকুরটি চরে অস্থায়ীভাবে বসবাস করা মানুষের মিঠাপানির জন্য করা হয়েছে। পুকুরপাড় দিয়ে আপনি নির্মিত সেতু পেরিয়ে এবার প্রবেশ করবেন ঘণ গহিন অরণ্যে। এ বনে সুন্দরী, কেওড়া, বাইন, গোলপাতাসহ আরও বিভিন্ন প্রজাতির ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ রয়েছে।
প্রকৃতির নিস্তব্ধতার মাঝে ণে ণে বনের গহিন অরন্য থেকে ডেকে ওঠা পাখির ডাক যেন আচমকা চমক ভাঙায়। ঘণ সবুজ বনাঞ্চল পেরিয়ে সাগরের বিশালতা মুগ্ধ করবে আপনাকে। দুপুরে সমুদ্রের পানি যৈন সৈকতে উপচে পরে। ফাতরার চরের পাশ জুড়েই সাগর পাড়ে আছড়ে পরে বিশাল ঢেউ। হেলে পড়া গাছের কান্ড, পাখি আর সবুজ পরিবেশ আপনাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে মুগ্ধতার জগতে। বনাঞ্চলের ঝাউগাছ, কেওড়া, ফাতরা, গেওয়া, গরান, বাইন গাছগুলো গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছে। সৈকতের পাড় জুড়ে কখনো মাঝিদের অলস নৌকা আবার কখনো সবুজে ঘেরা অরণ্য সৌন্দর্য ভ্রমন পিয়াসীদের মন ভরিয়ে তোলে অপরূপ রূপের ছোঁয়ায়।

আপনার মতামত লিখুন

ঢাকা,সারাদেশ বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ