মঙ্গলবার-২৩শে জুলাই, ২০১৯ ইং-৮ই শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, সময়: রাত ৮:২০
ছেলে ধরা আতংক গুজব থেকে সচেতনতা বাড়াতে শহর জুড়ে পুলিশের মাইকিং।। লালপুরে ওয়ালিয়া তরুণ সমাজের ৪র্থ প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালিত বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির দুর্নীতির দায়ে দুদুকের চার্জশিট দাখিল ॥ ডোমারে আরসিসি রাস্তা নির্মানের দাবীতে মানববন্ধন। কলাপাড়ায় পুকুরে ডুবে দুই ভাই-বোনের মৃত্যু।। গোবিন্দগঞ্জে বাঁধ ভেঙ্গে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত শৈলকুপায় গৃহবধূর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার!

নয়ন বন্ডের পিঠে বন্দুকের তিন গুলি, লাশ দেখতে মানুষের ভিড়

মুক্তিনিউজ২৪.কম ডেস্ক: বরগুনায় প্রকাশ্যে স্ত্রীর সামনে শাহ নেওয়াজ রিফাত শরীফ হত্যার ঘটনায় করা মামলার প্রধান আসামি সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড (২৫) পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের পূর্ব বুড়িরচর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

এ ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, নয়ন বন্ডকে পুলিশ ধরার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সে অস্ত্র প্রদর্শন করেছে। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে গুলিবিনিময়ে নয়ন নিহত হয়।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক জানিয়েছেন, নয়নের পিঠে বন্দুকের তিনটি গুলি বিদ্ধ হয়ে বুক দিয়ে বেরিয়ে গেছে।

তবে রিফাত হত্যা মামলার প্রধান আসামি নয়নকে আটক করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিচারিক আদালতে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।

আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

বরগুনায় পুলিশের প্রেস ব্রিফিং : গতকাল সকাল ১০টার দিকে বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন তাঁর কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিং করেন। তিনি বলেন, রিফাত শরীফ হত্যা মামলার পলাতক আসামিরা সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের পূর্ব বুড়িরচর গ্রামে আত্মগোপন করে আছে—এ তথ্য পায় পুলিশ। ভোর ৪টার দিকে বরগুনার পাথরঘাটা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বি এম আশ্রাফ উল্যাহর নেতৃত্বে বুড়িরচর গ্রামের পুরাকাটা ফেরিঘাট এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে আসামিরা পুলিশকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। পুলিশও আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি ছুড়লে নয়ন নিহত হয়। সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহজাহান, উপপরিদর্শক (এসআই) মো. হাবিবুর রহমান ও মো. মনিরুজ্জামান, কনস্টেবল মো. হাবিবুর রহমান আহত হন। তাঁদের মধ্যে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহজাহান ও এসআই হাবিবুর রহমানের অবস্থা গুরুতর। তাঁদের বরিশাল বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অন্য দুজনকে বরগুনা পুলিশ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন আরো জানান, ঘটনাস্থল থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি পিস্তলের গুলি, দুটি শটগানের কার্তুজের খালি খোসা ও তিনটি দেশীয় ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ।

এদিকে গতকাল দুপুর ১টার দিকে বরগুনা সদর হাসপাতালে নয়নের লাশের ময়নাতদন্ত শেষ হয়। বিকেল ৪টার পর তার মামা মো. মিজানুর রহমান লাশ গ্রহণ করেন। সদর উপজেলার গৌরীচন্না ইউনিয়নে নয়নের মামাবাড়িতে তার লাশ দাফন করা হবে বলে জানিয়েছেন মরদেহের সঙ্গে থাকা পুলিশের এসআই শামীম।

নয়নের মরদেহ ময়নাতদন্তকারী দলের নেতৃত্ব দেওয়া বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. হুমায়ুন শাহীন খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘নয়নের পিঠে বন্দুকের তিনটি গুলি বিদ্ধ হয়ে বুক দিয়ে বেরিয়ে গেছে। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে।’

নয়ন বরগুনা সরকারি কলেজ এলাকার মৃত ছিদ্দিকুর রহমানের ছেলে। মা সাহিদা বেগম নয়নকে নিয়ে বাড়িতে থাকতেন। তার বড় ভাই মিরাজ সিঙ্গাপুরপ্রবাসী।

রিফাতের পরিবারের বক্তব্য : নয়ন নিহত হওয়ার পর রিফাতের বাবা আব্দুল হালিম দুলাল শরীফ বাকি সব আসামিকে গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় আনার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। পুলিশ প্রশাসন ও গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে আর কোনো দিন ফিরে পাব না। তবে আর কোনো মায়ের কোল যেন খালি না হয়, সে জন্য সারা দেশে সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে।’ মা ডেইজি শরীফ বলেন, ‘নয়ন বন্ডও কোনো না কোনো মায়ের সন্তান। নয়ন মরে গেছে তাতে তো আমার কোনো লাভ হলো না। আমি তো আমার একমাত্র ছেলে রিফাতকে কোনো দিনই ফিরে পাব না।’

রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তিনি বাকি সব আসামির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।

নয়নের লাশ দেখতে মানুষের ভিড়, স্বস্তি প্রকাশ : সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারি নয়ন বন্ড নিহত হওয়ার খবর বরগুনায় ছড়িয়ে পড়ার পর শত শত লোক তার লাশ দেখতে পূর্ব বুড়িরচর গ্রামে ভিড় করে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বলছে, অন্য আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি খুনিদের যারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।

সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু গতকাল নিহত রিফাত শরীফের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তাঁর পরিবারকে সান্ত্বনা দেন। এ সময় সাংবাদিকরা নয়ন বন্ড নিহত হওয়ায় তাঁর প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে সংসদ সদস্য বলেন, ‘যেকোনো মৃত্যুর সংবাদই মানুষের জন্য দুঃখজনক। কিন্তু আজকে ক্রসফায়ারে প্রধান আসামি নিহত হয়েছে। এটা বরগুনাতে ঈদের মতো আনন্দ। একজন দুষ্ট লোক মারা গেছে।’

উল্লেখ্য, গত ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজ এলাকায় প্রকাশ্যে স্ত্রীর সামনে শাহ নেওয়ার রিফাত শরীফকে (২৫) রামদা দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়। ওই দিন বিকেলেই বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রিফাতের মৃত্যু হয়। হামলার ঘটনার একটি ভিডিও ভাইরাল হলে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়। ভিডিওটিতে দেখা যায়, সন্ত্রাসী দুই যুবক উপর্যুপরি কোপাচ্ছে রিফাতকে। রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি সন্ত্রাসী দুই যুবককে বারবার প্রতিহত করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।

নিহত রিফাত শরীফ সদর উপজেলার বড় লবণগোলা গ্রামের আব্দুল হালিম দুলাল শরীফের ছেলে। ওই দিনই তিনি ১২ জনকে আসামি করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরো পাঁচ-ছয়জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় সাব্বির আহমেদ নয়নকে। আসামির তালিকায় এর পরই রয়েছে রিফাত ফরাজী ও তাঁর ভাই রিশান ফরাজী।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাস দুয়েক আগে রিফাতের সঙ্গে মিন্নির বিয়ে হয়। স্ত্রীকে উত্ত্যক্ত করার ঘটনায় প্রতিবাদ করার জের ধরে নয়ন ও তার সহযোগীরা রিফাতকে কুপিয়ে হত্যা করেছে বলে মিন্নি অভিযোগ করেন। নয়ন তার মেসেঞ্জার গ্রুপ জিরো জিরো সেভেন (০০৭)-এর মাধ্যমে হত্যার পরিকল্পনা করে এমন তথ্যও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে পুলিশ এজাহারভুক্ত কয়েকজন আসামিসহ ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এর মধ্যে একজনের নাম জানায়নি পুলিশ।

এদিকে রিফাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বরিশালের বাবুগঞ্জে অবস্থিত কৃষি ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউটের ছাত্র মাহথির মুহাম্মাদ বিন ফরিদকে (১৭) পুলিশ পরিচয়ে ধরে নিয়ে গেছে। সোমবার রাতে ইনস্টিটিউটের ছাত্রাবাস থেকে তাকে নিয়ে যায় বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। মাহথির গৌরনদী উপজেলার আশুকাঠী গ্রামের ফরিদ উদ্দিনের ছেলে। ফরিদ উদ্দিন বরগুনা কৃষি অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মতিয়ার রহমানের গাড়িচালক। বাবার কাছ থেকে মাহথির বরগুনা জিলা স্কুলে লেখাপড়া করেছে। গত বছর এসএসসি পাস করেছে সে।

নিরাপত্তাহীনতায় মিন্নির পরিবার : বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন সোমবার রাতে রিফাতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির বাবার বাড়িতে গিয়ে পরিবারটির খোঁজখবর নিয়েছেন। পুলিশ লাইন এলাকায় মিন্নির বাবার বাড়ি। মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, রিফাত খুনের পর থেকেই বাসার বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছেন তাঁরা। এক ছেলে আর এক মেয়ে স্কুলে যেতে পারছে না। দুই-এক দিনের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে বলে পুলিশ সুপার আশ্বস্ত করেছেন।

আপনার মতামত লিখুন

ঢাকা,সারাদেশ বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ