শনিবার-২৫শে মে, ২০১৯ ইং-১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, সময়: বিকাল ৪:৫৯
গাইবান্ধা কারাগারে আসামি নিখোঁজ-উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তে কমিটি আন্তনগর ‘পঞ্চগড় এক্সপ্রেস’ ট্রেন উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী দ্বিতীয় মেঘনা ও দ্বিতীয় গোমতী সেতু উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী বসুন্ধরায় বাইতুল জান্নাত জামে মসজিদ উদ্বোধন চার সমুদ্রবন্দরে ৩, নদীবন্দরে ২ নম্বর সংকেত শুটিংয়ে আহত জন আব্রাহাম, সম্পূর্ণ বিশ্রামের নির্দেশ টয়ার ঈদ বিশেষ ‘সাইজ ৪২’

একজন আদর্শ শিক্ষক এবং পেশাগত আচরণ

1 month ago , বিভাগ : শিক্ষা,

মুক্তিনিউজ২৪.কম ডেস্ক: শাসনউড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টি নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলায় অবস্থিত। এটি তৃতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ‘বিদ্যালয়বিহীন গ্রামে ১৫০০ বিদ্যালয় স্থাপন’ প্রকল্পের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির শিক্ষকের পদসংখ্যা পাঁচজন। কিন্তু কর্মরত আছেন চারজন। বেশ কয়েক দিন পূর্বে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে এ বিদ্যালয়ে মো. আলমগীর আজাদ সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।

উপজেলা রিসোর্স সেন্টারে একটি প্রশিক্ষণে তার সঙ্গে আমার কথা হয়। তিনি আনন্দমোহন সরকারি বিশ^বিদ্যালয় কলেজ হতে পদার্থবিদ্যা বিষয়ে এমএসসি সম্পন্ন করেছেন। শিক্ষকতা পেশায় এসে তিনি খুবই আনন্দিত ও পুলকিত, পাশাপাশি তিনি শঙ্কিত ও চিন্তিত। কারণ পদার্থবিদ্যায় সম্মানসহ এমএসসি সম্পন্ন করলেও শিখন-শেখানো বিষয়ের ওপর তার কোনো ডিগ্রি/কোর্স নেই। এ বিষয়ে তার কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতাও নেই। প্রশিক্ষণের ফাঁকে ফাঁকে তার সঙ্গে শিক্ষকতা পেশার মৌলিক কিছু বিষয় এবং আদর্শ শিক্ষকের পেশাগত আচরণ নিয়ে আমার অনেক কথা হয়।

সরকারের বিভিন্ন দপ্তর, যেমন- স্বাস্থ্য, কৃষি, মৎস, প্রাণিসম্পদ বা যে কোনো বিভাগে টেকনিক্যাল পেশায় চাকরি করতে হলে তাকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষিত ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন হতে হয়। শিক্ষিত বলতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ন্যূনতম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা ডিপ্লোমাধারীকে বোঝানো হচ্ছে। শিক্ষকতা একটি জটিল পেশা। আর প্রাথমিক স্তরে শিক্ষকতা করা সবচেয়ে জটিল এবং স্পর্শকাতর বিষয়।

কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে শিক্ষকতা একটি জটিল পেশা সত্ত্বেও আমাদের দেশে এ বিষয়ে কোনো কারিগরি জ্ঞান (সিইনএড/ডিপিএড/বিএড) বা কেনোরকম পূর্ব-অভিজ্ঞতা ছাড়াই শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। নিয়োগকৃত শিক্ষকরা যে আবার নিয়োগের পরপরই মৌলিক প্রশিক্ষণ (বর্তমানে ডিপিএড প্রশিক্ষণ) করার সুযোগ পান তা কিন্তু নয়। অনেকের ক্ষেত্রে পাঁচ/ছয় বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। তবে বর্তমানে নব নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের উপজেলা রিসোর্স সেন্টারে ‘প্রারম্ভিক প্রশিক্ষণ’ (Induction Training) নামে একটি স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে; কিন্তু তা যথেষ্ট নয়।

প্রাথমিক শিক্ষা হলো শিক্ষার মূল ভিত্তি। এ সময়টা খুবই স্পর্শকাতর। তাই এ সময়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যথেষ্ট আন্তরিক ও সতর্কতামূলক আচরণ করতে হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণের অবশ্যই শিশু মনোবিজ্ঞানসহ শিশু-শিক্ষণের বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা উচিত। আর সবচেয়ে বেশি জরুরি হলো একজন শিক্ষকের পেশাগত আচরণ কী রকম হবে তা জানা। কারণ একজন শিক্ষকের সুদৃষ্টি, ভালো আচরণ, সঠিক দিক-নির্দেশনা, ইতিবাচক মনোভাব যেমন একজন শিক্ষার্থীকে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে দিতে পারে, তেমনি ছোটবেলায় একজন শিক্ষকের অবহেলা, ভুল ও নেতিবাচক আচরণ একজন শিক্ষার্থীর জীবনকেও অন্ধকারের চোরাগলিতে নিয়ে যেতে পারে। তাই প্রাথমিক স্তরে শিক্ষকের পেশাগত আচরণ কেমন হওয়া উচিত এ সম্পর্কে শিক্ষকের স্পষ্ট ধারণা থাকা খুবই সঙ্গত।

শিক্ষক সমাজ একটি দেশের সামগ্রিক অবকাঠামো গঠনের হাতিয়ার। সুশিক্ষা একটি জাতিকে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে দিতে পারে। সমাজে আলোকিত মানুষ গঠনে একজন শিক্ষকের অবদান অনস্বীকার্য আর আলোকিত মানুষ তৈরির মাধ্যমেই কেবল গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতিমুক্ত দেশ গঠন সম্ভব। যেহেতু শিক্ষকরা দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরি করেন, কাজেই একজন শিক্ষকই তৈরি করতে পারেন একজন ভালো প্রশাসক, বিচারক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, সাহিত্যিক তথা দেশ বা জাতি গঠনের আগামী প্রজন্ম।

জীবনঘনিষ্ঠ, উৎপাদনমুখী আত্মকর্মসংস্থান, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের লালনকারী, পরিবর্তনশীল আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে সক্ষম, নৈতিকতার নিরিখে মানসম্মত সৃজনশীল মনন বিনির্মাণে যিনি লব্ধ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর সামনে সঞ্চিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সাহায্যে বিষয়বস্তু উপস্থাপন করে শিক্ষার্থীর শিখনে পথ দেখানÑ তিনিই হলেন শিক্ষক। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড আর শিক্ষার মেরুদণ্ড হলো শিক্ষক। একটি দেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, টেকসই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে শিক্ষকের ভূমিকা অপরিসীম। শিক্ষক একজন শিল্পীর ন্যায় মানব মনের সহজাত প্রবৃত্তি বা শক্তি ও সুপ্ত সম্ভাবনার পরিস্ফুটন ঘটিয়ে সত্যিকারের মানুষ তৈরির কাজে নিয়োজিত থাকেন। কাক্সিক্ষত বিষয়বস্তু পাঠদানের মাধ্যমে একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর মনে দেশপ্রেম, মানবতাবোধ, নৈতিকতাবোধ, কায়িক শ্রমের মর্যাদা, নেতৃত্বের গুণাবলী, সৃজনশীলতা, সামাজিক অগ্রগতির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে অপরিহার্য কুশলী হিসেবে সম্পৃক্ত থাকেন। তাই একজন শিক্ষককে হতে হবে ধী-শক্তির অধিকারী, বুদ্ধি-প্রজ্ঞা হবে তার চলার পথের পাথেয়।

শিক্ষা একটি জাতির উন্নয়নের প্রধান মাধ্যম। যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত সে জাতি তত বেশি উন্নত। শিশুর শিক্ষা শুরু হয় শৈশবকাল থেকে। বিভিন্ন কারণে শিশুর মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সুষ্ঠু পরিবেশে শিশু বেড়ে উঠলে শিশুর মানসিক বিকাশও সুস্থ ও সুন্দর হয়। সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠা শিশু সুন্দর সমাজ তথা দেশ গড়তে সহায়তা করে। একটি শিশু যখন পাঁচ বছর বয়সে পদার্পণ করে তখন সে এলাকার অন্যান্য শিশুদের মতো বিদ্যালয়ে গমনের জন্য উৎসাহী হয়ে ওঠে। আর বিদ্যালয়ের পরিবেশ ইতিবাচক হলে শিশু সেখানে নিজেকে নিরাপদ মনে করে। অন্যদিকে নেতিবাচক পরিবেশে তার উৎসাহে ভাটা পড়ে। শিশু যখন তার নিজ বাড়ির নিরাপদ পরিবেশ ছেড়ে বিদ্যালয়ে গমন করে তখন বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণের কাছ থেকে শিক্ষার্থী এবং শিশুর পিতামাতা কিছু নির্ধারিত আচরণ প্রত্যাশা করে, যাতে শিশু নির্ভয়ে বিদ্যালয়ের শিখন-শেখানো কার্যাবলীতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে। পাশাপাশি নিজ বিদ্যালয় ও অন্য বিদ্যালয়ের সহকর্মী এবং সমাজের লোকজনের সঙ্গেও শিক্ষককে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতে হয়। একজন শিক্ষকের পেশাগত আচরণ, ব্যক্তিগত আচরণ এবং পেশাগত যোগ্যতা কেমন হবে তা নির্ভর করে তার সততা এবং পেশার প্রতি আন্তরিকতা, শ্রদ্ধাবোধ ও দায়িত্ববোধের ওপর। শিক্ষকগণের পেশাগত আচরণকে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সমাজ এবং সহকর্মীদের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ভিত্তিতে বিভিন্নভাবে শ্রেণীভুক্ত করা যায়।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকের আচরণ : শিক্ষক সকল শিক্ষার্থীর শেখার সমান সুযোগ সৃষ্টি করবেন। শিক্ষকতার প্রধান কাজ শিখন-শেখানো কার্যাবলী পরিচালনা করা। তাই শিক্ষক বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়বদ্ধ। যেমন- শিক্ষার্থীদের প্রত্যেককে ভালোভাবে জানা, তাদের স্বকীয়তাকে শ্রদ্ধা করা এবং তাদের প্রত্যেকের পৃথক পৃথক সক্ষমতাকে বিবেচনা করা, সব শিক্ষার্থীর জন্য নিরাপদ এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করা, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পেশাগত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা, প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রতি উচ্চাশা পোষণ করা, প্রতিটি শিক্ষার্থীর সক্ষমতাকে অনুধাবন করা এবং উন্নয়ন সাধন করা, সকল মতামত ন্যায়সঙ্গতভাবে বিবেচনায় আনা, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যথাযথভাবে যোগাযোগ স্থাপন করা।

শিক্ষকরা বিভিন্নভাবে তাদের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সৌজন্য ও মর্যাদার সম্পর্ক সৃষ্টি করবেন। যেমন- পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে উৎসাহিত করে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করার মাধ্যমে, নিরপেক্ষ এবং সম্মানজনক ভাষা ব্যবহারে উৎসাহিত করে, শিক্ষার্থীদের ভীতি-অস্বস্তি-অসম্মান এবং ক্ষতি থেকে নিরাপদ রেখে, শিক্ষার্থীদের স্বনির্ভরতা এবং নিজের ক্ষমতার প্রতি ধারণা বৃদ্ধি করে এবং তাদের নিজস্ব মূল্যবোধের উন্নয়ন ও প্রতিফলনকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে, শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত এবং স্পর্শকাতর বিষয়সমূহকে সম্মানজনক দৃষ্টিতে দেখে, গোপনীয় বিষয়সমূহের গোপনীয়তা রক্ষা করে সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ গ্রহণ করে, শিক্ষার্থীদের দৈহিক ও মানসিক শাস্তি (Corporal punishment) প্রদান থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে, অপরাধের উপযুক্ত প্রমাণসাপেক্ষে শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে ইত্যাদি।

শিক্ষকরা তাদের পেশাগত দক্ষতাসীমার মধ্যে থেকে নানামুখী কাজ করবেন। যেমন- শিক্ষকদের তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করার ক্ষেত্রে একটি বৃহৎ পরিসরে ভূমিকা পালন করা উচিত। তারা তাদের পেশাগত দক্ষতার গুণগত মান এবং সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে জ্ঞাত হয়ে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করবেন। তারা পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য উপযুক্ত শারীরিক, মানসিক এবং মানবিক সক্ষমতা অর্জন করার চেষ্টা করবেন, অন্যান্য পেশাজীবী শ্রেণী ও সংগঠনের কর্মকাণ্ড এবং শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা প্রদান সম্পর্কে সর্বদা সচেতন হবেন, তাদের যোগ্যতা-দক্ষতা এবং সামর্থ্য সম্পর্কে বিবরণ প্রদানের ক্ষেত্রে সর্বদা সত্যবাদী হবেন।

শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখবেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পিতা-মাতা বা বন্ধুর মতো আচরণ করবেন। তারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিখন-শেখানো কার্যক্রম সম্পাদনের ক্ষেত্রে কোনোরূপ পক্ষপাতদুষ্টতা বা অগ্রাধিকার প্রদর্শন করবেন না। শিক্ষার্থীদের সর্বোত্তম সুবিধা হয় এরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন, শিক্ষার্থীদের শিক্ষকরা কখনও তাদের ব্যক্তিগত কাজে নিয়োজিত করবেন না।

শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সর্বত্রই একটি পেশাগত সম্পর্কে আবদ্ধ থাকবেন। যেমন- শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ওপর সবসময় প্রভাব এবং আস্থার একটি মৌলিক অবস্থান রক্ষা করবেন; যা ভঙ্গ করা বা শিথিল করা উচিত নয়। তারা এমন পন্থায় তাদের দায়িত্ব পালন করবেন যা দ্বারা তাদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্কের মধ্যেও যে কিছু সীমাবদ্ধতা বা সীমারেখা আছে তা প্রতিফলিত হয়। শিক্ষকগণের পেশাগত সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে নানাবিদ কারণে। যেমন যদি তারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অশালীন উক্তি ব্যবহার করেন, উপযুক্ত কারণ ব্যতীত একজন শিক্ষার্থীকে স্পর্শ করেন, কোনো শিক্ষার্থীর সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত আলাপ করেন বা কোনো শিক্ষার্থীর সঙ্গে উপযুক্ত বিষয় ছাড়া লিখিত বা ইলেকট্রনিক যোগাযোগ স্থাপন করেন, শিক্ষার্থী বা তাদের পিতা-মাতার কাছ থেকে এমন উপহার গ্রহণ করেন, যা সঙ্গতকারণে তাদের প্রভাবিত করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয় ইত্যাদি।

পিতা-মাতা, অভিভাবক, পরিবার এবং সমাজের সঙ্গে শিক্ষকের সম্পর্ক : বিদ্যালয়ের পাশাপাশি সমাজে একজন ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি তৈরি করার জন্য শিক্ষকের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা থাকা জরুরি। শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা সমুন্নত রাখা কিংবা সমাজের উচ্চাসনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য শিক্ষকের ব্যক্তিগত আচরণ এবং পেশাগত দক্ষতা উন্নততর হতে হবে। শিক্ষকরা পিতা-মাতা বা অভিভাবকের সঙ্গে পেশাগত সম্পর্ক বজায় রাখবেন। তারা শিক্ষার্থীদের পিতা-মাতা বা অভিভাবকের প্রতি সম্মান এবং ভদ্রতা প্রদর্শন করবেন।

তারা শিক্ষার্থীদের শিক্ষা এবং উন্নয়নকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্তসমূহ নেয়ার সময় অভিভাবকের মতামতকে বিবেচনায় রাখবেন, শিক্ষার্থীদের উন্নয়ন ফলপ্রসূ করার লক্ষ্যে অভিভাবকদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রক্ষা করবেন, অভিভাবকদের অভিযোগকে আমলে নিয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন, শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পরিবার এবং সমাজের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক বজায় রাখবেন, শিক্ষার্থীরা ভিন্ন ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশ হতে আগতÑ এ বিষয়টি শিক্ষকগণ অনুধাবন করবেন। শিক্ষার্থীদের পরিবার এবং সমাজের সঙ্গে উক্ত ভিন্ন ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষকরা সহযোগিতার মাধ্যমে কাজ করার চেষ্টা করবেন।

সহকর্মীদের সঙ্গে শিক্ষকদের সম্পর্ক : সহকর্মীদের সঙ্গে কাক্সিক্ষত ও সৌজন্যমূলক আচরণ শিক্ষকতা পেশার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিক্ষকরা একে অপরের প্রতি ভদ্রতা বজায় রাখবেন এবং সম্মানজনক আচরণ করবেন, সহকর্মীদের মেধাকে মূল্যায়ন করবেন, পেশাগত বিষয়ে গঠনমূলক বিতর্কের জন্য উপযুক্ত সভা করবেন, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে জ্ঞান এবং দক্ষতা বিনিময় করবেন, শিক্ষকতা পেশায় ব্যবহৃত বিভিন্ন পদ্ধতিকে সম্মান করবেন এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখবেন, পেশায় যারা নতুন তাদের শিখন-শেখানো পদ্ধতি ও কৌশল পরিচালনার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবেন, শিক্ষার্থীদের কল্যাণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য বিনিময় করবেন।

শিক্ষকতা পেশায় শিক্ষকের ব্যক্তিগত আচরণ : ব্যক্তিগত আচরণ একজন শিক্ষকের পেশাগত অবস্থান এবং সামগ্রিকভাবে পেশার ওপর প্রভাব ফেলে। যদিও একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত এবং পেশাগত আচরণের মধ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট সীমা নেই, তবুও শিক্ষকের কাছ থেকে এটা প্রত্যাশিত যে তারা বিদ্যালয় এবং সমাজে একজন ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব হবেন, আইনের শাসনকে শ্রদ্ধা করবেন এবং নাগরিক হিসেবে আইনগত বাধ্যবাধকতা পালনের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন, ব্যক্তিগত বা আর্থিক কোনো লাভের আশায় নিজেদের অবস্থানকে ব্যবহার করবেন না, ব্যক্তিগত বা আর্থিক স্বার্থ তাদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যাতে সাংঘর্ষিক না হয় তা নিশ্চিত করবেন, কর্মক্ষেত্রবিষয়ক আলোচনার ক্ষেত্রে সতর্কতার সঙ্গে আচরণ করবেন এবং প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা বজায় রাখবেন, স্থানীয় কমিউনিটির সঙ্গে ভালো ও ইতিবাচক সম্পর্ক স্থাপন করবেন।

শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতা : শিক্ষকরা তাদের পেশাদারিত্বকে মূল্যায়ন করবেন এবং একটি উন্নতমানের দক্ষতার ক্ষেত্র তৈরি করে তা বজায় রাখবেন। তারা পেশাগত জ্ঞান লাভের প্রচেষ্টায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকবেন, তাদের দায়িত্বসমূহ নির্ভরযোগ্যভাবে, সম্পর্ণূরূপে এবং সঠিক সময়ে সম্পন্ন করবেন, শিক্ষকরা তাদের পেশার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় আইন সম্বন্ধে জ্ঞাত থাকবেন। বিশেষত তারা বৈষম্য, হয়রানি এবং অপবাদ-প্রচারণা, অবহেলা, নিয়মিত উপস্থিতি, ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক গোপনীয়তা প্রভৃতি সম্পর্কিত আইনগত দায়িত্বের বিষয়ে সচেতন হবেন।

শ্রেণীকক্ষে একটি শিশুবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে ও বজায় রেখে যথাযথভাবে শিখন-শেখানো কার্যক্রম পরিচালনা করা একজন শিক্ষকের প্রধান দায়িত্ব। শিক্ষককে তাই হতে হবে শিশুর বন্ধু। শিশুর সঙ্গে তিনি এমনভাবে মিশে যাবেন, কথা বলবেন অথবা যোগাযোগ ও মিথস্ক্রিয়া করবেন, যাতে শিশু পরম আস্থার সঙ্গে তার ওপর নির্ভর করতে পারে। যেমনভাবে সে নির্ভর করে তার বাবা-মা, পরিবার-পরিজন বা অন্যান্য নিকট-আত্মীয়ের ওপর। প্রাথমিক স্তরের শিখন-শেখানো প্রক্রিয়ায় শিক্ষকের ভূমিকা হবে তাই সহায়তাকারীর- যিনি শিখনবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করে পদে পদে শিশুকে নানা কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিয়ে তাকে নানাভাবে শিখতে সহায়তা করবেন।

এমন কিছু বিষয় আছে শিক্ষক হিসেবে যা কখনও করা যাবে না। যেমন- পূর্বপ্রস্তুতি না নিয়ে শ্রেণীকক্ষে যাওয়া, পাঠপরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয়/আবশ্যকীয় শিক্ষা উপকরণ ছাড়া শ্রেণীকক্ষে যাওয়া, পাঠের কাক্সিক্ষত শিখনফল সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা না নিয়ে শ্রেণী-কার্যক্রম পরিচালনা করা, কোনো শিশুকে যে কোনো রকম শারীরিক বা মানসিক শাস্তি দেয়া (যেমন- চড় দেয়া, ধাক্কা দেয়া, বেত্রাঘাত করা, দাঁড় করিয়ে রাখা ইত্যাদি)।

শিশুকে কোনো সময় এমন কোনো কথা বলা যাতে সে মানসিক কষ্ট পায় (যেমন- তুই বলা, মা-বাবার কথা তুলে বকা দেয়া, কোনোদিন পারে না, বুদ্ধি নাই এ ধরনের কথা বলা), শিশুর জন্য নিরাপদ ও উপযুক্ত নয় এমন কোনো কাজ করতে বাধ্য করা (যেমন- খুব ভারি কোনো বস্তু আনতে বলা, ধারালো কোনো বস্তু দিয়ে কাজ করানো, শিক্ষার্থীদের দিয়ে বিস্কুটের কার্টন টানানো, বই টানানো ইত্যাদি), ভিন্ন সামাজিক অবস্থা (জাতি, গোষ্ঠী, ধর্ম ইত্যাদি) থেকে আগত শিশুদের অবহেলা করা, মেয়ে ও ছেলে শিশুদের মধ্যে বিভেদ বা বৈষম্য করা, শিশুর প্রতিবন্ধিতা নিয়ে কোনোরকম বিরূপ মন্তব্য বা কটাক্ষ করা, শ্রেণী-কার্যক্রমের সময় শুরু হওয়ার পরও শ্রেণীকক্ষে অবস্থান না করা, শ্রেণীকক্ষে চেয়ারে বসে শ্রেণী-কার্যক্রম পরিচালনা করা, অপারগ শিশুকে তিরস্কার করা ইত্যাদি।

আদর্শ শিক্ষক হতে হলে কতগুলো অভ্যাস নিজের মাঝে গড়ে তোলা এবং এগুলোর নিয়মিত চর্চা করা খুবই জরুরি। যেমন- সুন্দর বাচনভঙ্গি, আকর্ষণীয় উপস্থাপন কৌশল, সুনির্দিষ্ট বিষয়ে জ্ঞানের গভীরতা, দূরদর্শী, কৌশলী, কাজের প্রতি ভালোবাসা, বন্ধুবৎসল হওয়া, অন্যের মতামতের প্রতি গুরুত্ব দেয়া, ভালো শ্রোতা হওয়া, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও আদর্শবোধে উজ্জীবিত হওয়া, সহনশীলতা, পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব. জ্ঞানপিপাসু ইত্যাদি।

শিক্ষকতা শুধু একটি বৃত্তি বা পেশা নয়। এটি একটি আরাধনা। শিক্ষক একজন শিক্ষাব্রতী ও মূল্যবোধসম্পন্ন পেশাজীবী। প্রাথমিক স্তরের যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রমের সফল বাস্তবায়নের জন্য একজন শিক্ষক যখন তার শিক্ষকতা পেশায় প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় ঘটিয়ে তার দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হন এবং নতুন পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা প্রয়োগের ক্ষমতা রাখেন তখন তিনি যোগ্য শিক্ষক হিসেবে বিবেচিত হন। শিক্ষক শব্দের ব্যবচ্ছেদ করেও একজন আদর্শ শিক্ষকের বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করা সম্ভব। যেমন- শি>শিষ্টগুণী, ক্ষ>ক্ষমাশীল, ক>কর্তব্যনিষ্ঠ। যেসব শিক্ষকের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে এসব গুণের সমন্বয় ঘটে প্রকৃত অর্থে তারাই আদর্শ ও সফল শিক্ষক।

প্রাথমিক স্তরে শিক্ষকের ওপর শিশুরা যেন এমনভাবে নির্ভর করতে পারে, যেমনভাবে সে নির্ভর করে তার বাবা-মা, পরিবার-পরিজন বা অন্যান্য নিকটাত্মীয়ের ওপর। আদর্শ ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের জ্ঞান ও গুণে মুগ্ধ শিক্ষার্থী শিক্ষককে দেবতাতুল্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে। স্যার মোজাফফর আহমেদের একটি লেখা থেকে দুটি লাইন তুলে ধরে এ লেখার সমাপ্তি টানছি- ‘শিক্ষকতা একটা ধর্ম, একে জীবনে ধারণ করতে হয়; জ্ঞানীমাত্রই শিক্ষক নন।’

লেখক : প্রাবন্ধিক, শিক্ষা-গবেষক ও ইন্সট্রাক্টর, উপজেলা রিসোর্স সেন্টার (ইউআরসি)সূত্র: দৈনিকশিক্ষা

আপনার মতামত লিখুন

শিক্ষা বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ