শনিবার-২৫শে মে, ২০১৯ ইং-১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, সময়: বিকাল ৫:৫৮
গাইবান্ধা কারাগারে আসামি নিখোঁজ-উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তে কমিটি আন্তনগর ‘পঞ্চগড় এক্সপ্রেস’ ট্রেন উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী দ্বিতীয় মেঘনা ও দ্বিতীয় গোমতী সেতু উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী বসুন্ধরায় বাইতুল জান্নাত জামে মসজিদ উদ্বোধন চার সমুদ্রবন্দরে ৩, নদীবন্দরে ২ নম্বর সংকেত শুটিংয়ে আহত জন আব্রাহাম, সম্পূর্ণ বিশ্রামের নির্দেশ টয়ার ঈদ বিশেষ ‘সাইজ ৪২’

অমুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা স্থগিত

মুক্তিনিউজ২৪.কম ডেস্ক: যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই ও জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) অনুমোদন ছাড়াই গেজেটভুক্ত হয়েছেন অর্ধলক্ষাধিক অমুক্তিযোদ্ধা (ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা)। তাদের মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও ভাতা স্থগিত করা হচ্ছে। শিগগিরই এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের (ইউএনও) চিঠি দেবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এদের বাদ দিয়ে আগামী ২৬ মার্চের আগেই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রকাশ করবে সরকার। এর পরপরই তাদের স্মার্টকার্ড দেয়া হবে ।

জানা গেছে, ২০০২ সালে জামুকা প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত সব ধরনের যাচাই বাছাই শেষে কম-বেশি তিন হাজার ২শ’ ব্যক্তিকে গেজেটভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। অথচ এ সময়ের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার গেজেট প্রকাশ হয়েছে ৫৫ হাজারের বেশি। এর মধ্যে বিএনপি-জামায়াত জোটের মেয়াদে ৪৪ হাজার এবং আওয়ামী লীগের (২০০৯-১৩) মেয়াদে ১১ হাজার গেজেটভুক্ত করা হয়। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে গেজেটভুক্ত হওয়া এ ৫৫ হাজারের মধ্যেই সমস্যা বেশি। এখান থেকেই অমুক্তিযোদ্ধাদের (ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা) ভাতা ও সনদ স্থগিত হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক মঙ্গলবার নিজ দফতরে যুগান্তরকে বলেন, ‘গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা হতে হলে উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটির সুপারিশ থাকতে হয়। সুপারিশসহ প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য জামুকার বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। জামুকার সম্মতির ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নামে গেজেট জারি করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এটিই গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার নিয়ম। কিন্তু সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, যাচাই-বাছাই কমিটির সুপারিশ নেই, জামুকার অনুমোদন নেই, কেউ আবেদনে লিখে দিয়েছে, সেটারই গেজেট হয়েছে। এক কথায় যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বেআইনিভাবে যাদের গেজেট হয়েছে, তাদেরটাই স্থগিত হবে। তাদের বাদ দিয়ে ২৬ মার্চের আগেই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রকাশ করা হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আট ধরনের বারকোড দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সনদ ও স্মার্টকার্ড দেয়া হবে।’ তবে স্থগিত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে যারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তাদের নিয়ম মেনে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে আবারও মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকবে বলেও জানান মন্ত্রী। যুগান্তর

এ ধরনের অমুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কত জানতে চাইলে মোজাম্মেল হক বলেন, ‘এটা এ মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়। এজন্য তথ্য যাচাই-বাছাই করতে কিছু ক্যাটাগরি নির্দিষ্ট করে চিঠি তৈরি হচ্ছে। শিগগিরই তা ডিসি ও ইউএনওদের কাছে পাঠানো হবে। তাদের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই এর সঠিক সংখ্যা জানা যাবে।’ মন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোটের ৪৪ হাজার ও আওয়ামী লীগ আমলের ১১ হাজারসহ ৫৫ হাজার গেজেটভুক্তদের মধ্যেই এর ধরনের সমস্যা বেশি। স্থগিত হলে এদের মধ্য থেকেই হবে বলেও আভাস দেন।

এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ও ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির প্রধান শাহরিয়ার কবির যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা আগে থেকেই বলে আসছি মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অনেক ভুয়া ও অমুক্তিযোদ্ধা রয়েছে। দেরিতে হলেও এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদেরই ভাতা ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়া উচিত। এ কারণেই তালিকা বা গেজেট জারি করা হয়েছে।’ বিধিবহির্ভূভাবে যারা গেজেটভুক্ত হয়েছেন তাদের অমুক্তিযোদ্ধা আখ্যা দেয়ার কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘তাদের মধ্যে হয়তো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাও থাকতে পারেন তাদের আইন ও নিয়ম মেনে গেজেটভুক্ত করতে হবে।’

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধার ভারতীয় তালিকা, কল্যাণ ট্রাস্টের তৈরি শহীদ বেসামরিক গেজেট, সশস্ত্র বাহিনী শহীদ গেজেট, বিজিবির শহীদ গেজেট, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার গেজেট, খেতাবপ্রাপ্তদের গেজেট, মুজিবনগর গেজেট, বিসিএস ধারণাগত জ্যেষ্ঠতা প্রাপ্ত কর্মকর্তা গেজেট প্রকাশ হয়েছে। এছাড়া বিসিএস গেজেট, সেনাবাহিনী গেজেট, বিমান বাহিনী গেজেট, নৌ বাহিনী গেজেট, নৌ-কমান্ডো গেজেট, বিজিবি গেজেট, পুলিশ বাহিনী গেজেট, আনসার বাহিনী গেজেট, স্বাধীন বাংলা বেতার শব্দ সৈনিক গেজেট, বীরাঙ্গনা গেজেট আলাদাভাবে প্রকাশ হয়। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন গেরিলা বাহিনী, লালমুক্তিবার্তা, লাল মুক্তিবার্তায় স্মরণীয় যারা বরণীয় যারা, মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতীয় তালিকা (সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী), ভারতীয় তালিকা (পদ্মা), ভারতীয় তালিকা (মেঘনা), যুদ্ধাহত পঙ্গু বিজিবি, যুদ্ধাহত বিজিবি, সেক্টর অনুযায়ী ভারতীয় তালিকা, বিশ্রামগঞ্জ হাসপাতালে দায়িত্বপালনকারী ও যুদ্ধাহত সেনা গেজেটেও আছে। এসব গেজেটে প্রকাশিত মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা, সুযোগ সুবিধা বহাল থাকবে।

জানা গেছে, স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও চূড়ান্ত হয়নি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা। এ পর্যন্ত সরকারিভাবে তৈরি হয়েছে পাঁচটি তালিকা। এসব তালিকায় সর্বনিু মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৭০ হাজার ৮৯৬ জন, সর্বোচ্চ দুই লাখেরও বেশি। ইতিমধ্যে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পেতে নতুন করে ১ লাখ ৩৪ হাজার ব্যক্তি আবেদন করেছেন। এসব আবেদন যাচাই-বাছাই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা চূড়ান্ত করতে সারা দেশে ৪৭০টি উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করে সরকার। আইনি জটিলতা ও ত্রুটিযুক্ত প্রতিবেদনের কারণে ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ষষ্ঠ তালিকা প্রণয়নের কাজও স্থগিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১০টি কমিটি আইনি জটিলতায় এখনও প্রতিবেদন দিতে পারেনি। এসব উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ে নতুন কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বাকি ৩৬০টি কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলেও তাতে রয়েছে প্রচুর অসঙ্গতি ও ভুলত্রুটি। এসব অসঙ্গতি দূর করে প্রতিবেদন দিতে গঠন করা হয়েছে উপকমিটি। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১১০ উপজেলায় নতুন করে ৭ সদস্য বিশিষ্ট যাচাই-বাছাই কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আমরা সব উপজেলার প্রতিবেদন পাইনি। যেগুলো পেয়েছি তার বেশিরভাগই মনগড়া। নীতিমালা অনুযায়ী যেভাবে রিপোর্ট করার কথা, যে ছক দেয়া ছিল, সেই ছক অনুযায়ী মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ পেয়েছি। ৯৭ ভাগ ক্ষেত্রে শুধু মতামত দিয়েছে, কারণ বলা হয়নি। প্রতিবেদন ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় অনুমোদিত হয়নি।’

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মূলত রাজনৈতিক কারণেই মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা চূড়ান্ত করা যাচ্ছে না। সরকার বদলের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধার তালিকার পরিবর্তন প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে। আর এ কারণেই দিন দিন বাড়ছে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা। তবে তালিকা চূড়ান্ত না হলেও এ মুহূর্তে গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ লাখ ৩১ হাজার ৩৮৫। এর মধ্যে ভাতা পাচ্ছেন ১ লাখ ৮৭ হাজার ২৯৩ জন। তাদের প্রত্যেককে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা করে সম্মানী ভাতা দেয়া হয়। এর বাইরে বীরশ্রেষ্ঠদের পরিবারকে মাসিক ৩৫ হাজার টাকা, বীর উত্তমদের মাসিক ২৫ হাজার টাকা, বীর বিক্রমদের ২০ হাজার টাকা, বীর প্রতীকদের মাসিক ১৫ হাজার টাকা হারে সম্মানী দেয়া হচ্ছে। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি ক্যাটাগরিতে সর্বোচ্চ ৪৫ হাজার টাকা ও সর্বনিু ২৫ হাজার টাকা এবং শহীদ পরিবারকে ৩০ হাজার টাকা ভাতা দেয়া হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ও উৎসব ভাতা বাবদ ৩ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া এ অর্থবছর থেকে জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের জন প্রতি ৫ হাজার টাকা হারে মহান বিজয় দিবস ভাতা এবং সব মুক্তিযোদ্ধার অনুকূলে মূল ভাতার ২০ ভাগ হারে বাংলা নববর্ষ ভাতা দেয়া হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন

মুক্তিযুদ্ধ বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ