বুধবার,১৯শে ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং,৫ই পৌষ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, সময়: রাত ২:৫৪
বাউয়েটের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্যের বিদায় সংবর্ধনা সারাদেশে ১ হাজার ১৬ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করবে সেনাবাহিনী মধ্যপাড়া পাথর খনিতে সেরা খনি শ্রমিক হিসেবে ৫৫ জন পুরস্কৃত আপনাদের সেবক হিসেবে পাশে ছিলাম -এমপি মানিক ভুলভ্রান্তি হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন: শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের আরো পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকা প্রয়োজন : প্রধানমন্ত্রী

বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালে খালেদা জিয়া

গতকাল বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে বিএনপি চেয়ারপারসনকে ওই হাসপাতালের কেবিন ব্লকে তাঁর জন্য প্রস্তুত রাখা ৬১২ নম্বর কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কারাবিধি অনুসারে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া বিশেষ বিবেচনায় পাশের আরেকটি কক্ষও তাঁর জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে খালেদা জিয়ার গৃহকর্মী ফাতেমাও রয়েছেন।

বিকেলেই মেডিক্যাল বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এম এ জলিল চৌধুরী ও ফিজিক্যাল মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক ডা. বদরুন্নেসা আহমেদ খালেদা জিয়ার কক্ষে গিয়ে তাঁর স্বাস্থ্যের প্রাথমিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন বলে হাসপাতাল সূত্র জানায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহ আল হারুন কালের কণ্ঠকে জানান, আজ রবিবার পূর্ণাঙ্গ মেডিক্যাল বোর্ডের সদস্যরা তাঁর চিকিৎসার বিষয়ে বৈঠকে বসে পরবর্তী করণীয় ঠিক করবেন।

পরিচালক জানান, আদালতের নির্দেশমতো পূর্বগঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের বিএসএমএমইউর ইন্টারনাল মেডিসিনের অধ্যাপক আব্দুল জলিল চৌধুরী ও ফিজিক্যাল মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক বদরুন্নেসা আহমেদকে বহাল রেখে কার্ডিওলজির অধ্যাপক হারিসুল হক, অর্থোপেডিক সার্জারির অধ্যাপক আবু জাফর চৌধুরী, চক্ষুর সহযোগী অধ্যাপক তারেক রেজা আলীকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের জায়গায় নতুন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিওলজির প্রধান অধ্যাপক ডা. সজল কুমার ব্যানার্জি, রিউমাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. আতিকুল হক ও অর্থপেডিক সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক নকুল কুমার দত্তকে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহ আল হারুন বলেন, ‘আদালতের নির্দেশ অনুসারে আমরা বেগম খালেদা জিয়ার পছন্দ অনুসারে প্রয়োজনে অন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদেরও আমন্ত্রণ জানাতে পারব। আর আদালতের নির্দেশেই কোনো রাজনৈতিক দলের সহযোগী কোনো সংগঠনের কোনো পদে আছেন এমন কাউকে বোর্ডে রাখা হয়নি।’

খালেদা জিয়াকে আপনি কেমন দেখেছেন—সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের জবাবে হারুন অর রশিদ বলেন, ‘অধ্যাপক আব্দুল জলিল চৌধুরী ওনাকে দেখেছেন। তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। রবিবার মেডিক্যাল বোর্ডের সভার পরে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।’ ‘খালেদা জিয়াকে খুবই অসুস্থ দেখা গেছে’—বিএনপি নেতাদের এমন কথা তাঁকে জানানো হলে হারুন অর রশিদ বলেন, ‘উনি কিন্তু আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, কুশল বিনিময় করেছেন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মহোদয় দেখা করেছেন এবং ওনার সঙ্গে আমাদের বিস্তারিত কথাবার্তা হয়েছে।’

খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে আনার আগে পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দীন রোডের পুরনো কারাগারে বাইরে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা দেখা গেছে। পুলিশ ও র‌্যাবের তৎপরতা ছিল দুপুর থেকেই। কারাগারের সামনে ছিল বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারাও। দুপুরের পর থেকে কারাগারসংলগ্ন মাক্কুশা মাজারের সামনে, বকশীবাজার মোড়ে পুলিশ অবস্থান নিয়ে গাড়ি চলাচলও নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। এরপর সোয়া ৩টার দিকে খালেদা জিয়াকে নিয়ে বের হয়ে আসে পুলিশের গাড়িটি।

হুইলচেয়ারে ওঠেন, হুইলচেয়ারে নামেন : কারা সূত্র জানায়, খালেদা জিয়া হাসপাতালে যাওয়ার জন্য সকাল থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন। সাধারণত, ফজরের নামাজ পড়ে ঘুমানোর পর দুপুর ১২টা সাড়ে ১২টার আগে তিনি ঘুম থেকে ওঠেন না। গতকাল সকাল ১০টার দিকে উঠে যান তিনি। এরপর নাস্তা করেন। তাঁকে নেওয়ার জন্য পুলিশের গাড়িটি কারাগারে তাঁকে রাখা ভবনের কাছ পর্যন্ত যায়। ভবন থেকে তাঁকে হুইলচেয়ারে করে নামিয়ে আনা হয়। এরপর বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালে নিয়ে পৌঁছার পর হুইলচেয়ারে করেই তাঁকে ছয়তলার কেবিনে উঠানো হয়।

হাসপাতালে যাওয়ার জন্য গাড়িতে ওঠার আগেও তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন কারা চিকিৎসক। গতকাল বিকেলে কারা চিকিৎসক ডা. মাহমুদুল হাসান শুভ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উনাকে গাড়িতে তোলার আগে প্রেসার মাপা হয়েছে। তাঁর প্রেসার স্বাভাবিক পাওয়া যায়।’

যেভাবে নেওয়া হলো : গত বৃহস্পতিবার আদালতের নির্দেশের কপি কারাগার ও হাসপাতালে পৌঁছার পর থেকেই দুটি প্রতিষ্ঠানের কর্তারা প্রস্তুতি নিতে থাকেন। ওই দিনই তাঁকে কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু খালেদা জিয়া শুক্রবার যেতে রাজি না হয়ে পরদিন অর্থাৎ গতকাল যাওয়ার কথা জানালে সেভাবেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়। দুপুর ১২টার দিক থেকেই পুলিশ নাজিমুদ্দীন রোডসহ কারাগারের আশপাশ এলাকায় অবস্থান নিতে শুরু করে। দুপুর ১টার পর চকবাজারের মুখে, কারাগারের পাশে মসজিদসংলগ্ন এলাকায় পুলিশ পাহারা আরো বাড়ানো হয়। সেখানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও রাখা হয়েছিল। দুপুর ২টা ২৫ মিনিটের দিকে কারাগারের সামনে আসে পুলিশের একটি অ্যাম্বুল্যান্স। এই অ্যাম্বুল্যান্সে একজন চিকিৎসককে দেখা যায়। তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।

এর কিছুক্ষণ পরই র‌্যাবের একটি পিকআপ কারাগারের ভেতর থেকে বের হতে দেখা যায়। তাতে খালেদা জিয়ার ব্যবহৃত জিনিসপত্র ছিল। বিকেল পৌনে ৩টার দিকে পুলিশের সাদা রঙের একটি প্রাইভেট কার  কারাগারের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। বেলা সোয়া ৩টার দিকে খালেদা জিয়াকে নিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসে পুলিশের সাদা রঙের গাড়িটি। এর সামনে-পেছনে ছিল পুলিশ, র‌্যাবের কয়েকটি গাড়ি। একটি অ্যাম্বুল্যান্সও ছিল গাড়িবহরে।

গোলাপি রঙের শাড়ি পরা খালেদা জিয়া গাড়ি থেকে নেমে হুইলচেয়ারে ওঠেন। এরপর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালের কেবিন ব্লকের ছয়তলায়। কয়েকটি ব্যাগও এ সময় নামানো হয় গাড়ি থেকে। বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতা ও শখানেক কর্মী এর আগেই হাসপাতাল প্রাঙ্গণে জড়ো হয়েছিল। তবে পুলিশের বাধার কারণে তারা দলীয় নেত্রীর কাছে যেতে পারেনি। তবে প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে নেত্রীর মুক্তির দাবিতে স্লোগান দেন মহিলা দলের নেতাকর্মীরা।

হাসপাতালের ভেতরে বিএনপি নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, কেন্দ্রীয় নেতা জয়নাল আবেদীন, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, নিতাই রায় চৌধুরী, আমানউল্লাহ আমান, খায়রুল কবীর খোকন, নাজিমউদ্দিন আলম, এ কে এম আজিজুল হক, ফরহাদ হালিম ডোনার, শিরিন সুলতানা, সানাউল্লাহ মিয়া, হেলেন জেরিন খান, শাম্মী আখতার, ডা. সালাউদ্দিন মোল্লা প্রমুখ।

‘আদালতের নির্দেশ মানেনি সরকার’ 

খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য মেডিক্যাল বোর্ড উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পুনর্গঠিত হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ডক্টরস অসোসিয়েশনের মহাসচিব অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘যে তিনজন নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তা আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী হয়নি।’ তিনি আরো বলেন, ‘আদালতের নির্দেশনা ছিল মেডিক্যাল বোর্ডে স্বাধীনতা চিকিৎসা পরিষদ (স্বাচিপ) ও ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) কেউ প্রাথমিক সদস্যপদও থাকতে পারবেন না। এখন বোর্ডে যাঁদের রাখা হয়েছে, বিশেষ করে যে তিনজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যদি নাম ধরেই বলা হয়, সজল কৃষ্ণ ব্যানার্জি ও নুকুল কুমার দত্ত—ওনারা তো স্বাচিপের লাইভ মেম্বার। এমনকি বদরুন্নেসা আহমেদও স্বাচিপের সদস্য।’

দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কেন্দ্রীয় নেতারা গতকাল হাসপাতালে গেলেও খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাননি। হাসপাতালে ফখরুল সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘কোন হাসপাতালে চিকিৎসা হচ্ছে সেটা নিয়ে ভাবছি না, আমরা তাঁর সুচিকিৎসা চাই।’ এখানে খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার বিষয়ে আশাবাদী কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেহেতু আদালত বলেছেন চেয়ারপারসনের পছন্দ অনুযায়ী তাঁর জন্য নতুন মেডিক্যাল বোর্ডে তিনজন পছন্দের চিকিৎসক থাকবেন, সেহেতু আমরা সুচিকিৎসা নিয়ে আশাবাদী।’

ইউনাইটেডে নেওয়ার আবেদন ছিল : গত ৯ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে দেখা করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির সাত সদস্য। তাঁরা খালেদা জিয়াকে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করার আবেদন জানান। তাঁদের বৈঠকের সময়ই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইজি প্রিজনস ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিনকে ডেকে পাঠান। তাঁর কাছ থেকে খালেদা জিয়ার অসুস্থতার বর্তমান অবস্থা জানে দুই পক্ষই। ওই দিনই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, বিএনপি নেতাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রসচিব ও আইজি প্রিজনসকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দিয়ে একটি বোর্ড গঠন করে বিএনপি নেত্রীর স্বাস্থ্যের বিষয়টি দেখার জন্য। আগেও এমন বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘তাঁকে যাঁরা চিকিৎসা করেন এবং সরকারি ডাক্তারদের সুপারিশ অনুযায়ী আমরা সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেব।’

এর পাঁচ দিন পর ১৩ সেপ্টেম্বর একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়। এই বোর্ডে ছিলেন বিএসএমএমইউর কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক হারিসুল হক, অর্থপেডিক সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু জাফর চৌধুরী বীরু, চক্ষু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তারিক রেজা আলী ও ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বদরুন্নেসা আহমেদ। গত ১৫ সেপ্টেম্বর এই পাঁচ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড কারাগারে গিয়ে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে। পরদিন ১৬ সেপ্টেম্বর সেই স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতি বিবেচনায় খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেওয়ার মত দেওয়া হয়। তবে যে হাসপাতালে সব ধরনের চিকিৎসা সুবিধা রয়েছে সেই হাসপাতালের কথা সুপারিশ করা হয়। সেই বিবেচনায় বিএসএমএমইউ হাসপাতালের কথাই উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। তবে খালেদা জিয়া রাজি না হওয়ায় তাঁকে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়া যায়নি বলে জানায় কারা কর্তৃপক্ষ। অবশেষে হাইকোর্টের নির্দেশের পর তিনি রাজি হওয়ায় গতকাল তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

রাজনীতি,সারাদেশ বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ