রবিবার-২১শে এপ্রিল, ২০১৯ ইং-৮ই বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, সময়: সকাল ১০:৫৭
ফেরদৌসের সমালোচনায় যা বললেন মোদি তিন দিনের সরকারি সফরে ব্রুনেইয়ের পথে প্রধানমন্ত্রী প্যারোলের বিষয়ে নমনীয় খালেদা! তিন দিনের সফরে প্রধানমন্ত্রী ব্রুনাই যাচ্ছেন আজ আজ পবিত্র শবেবরাত নারায়ণগঞ্জে বাহারি রঙের ঘুড়ি উৎসব পার্বতীপুর মধ্যপাড়া খনিতে ১৬ দিন ধরে পাথর উত্তোলন বন্ধ

নিম্নমানের বইয়ের যন্ত্রণায় বিরক্ত পাঠক

3 months ago , বিভাগ : শিক্ষা,

মুক্তিনিউজ২৪.কম ডেস্ক: কড়া নাড়ছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। আর গ্রন্থমেলা মানেই গদ্য-পদ্য, প্রবন্ধসহ বিচিত্র বিষয়ের গ্রন্থের সমাহার। প্রতি মেলায়ই প্রকাশিত হয় হাজার হাজার বই। তবে এই হাজার বইয়ের ভিড়ে মানসম্মত বই খুঁজে পেতে হিমশিম খেতে হয় পাঠককে। বিষয় ও রচনাশৈলীর দুর্বলতা, ভুল বানান এবং সর্বোপরি সম্পাদনাজনিত ত্রুটিতে চরম মানহীন বইয়ের যাতনা মেলায় আসা অধিকাংশ বইয়ে।

তাই প্রতি বছর গ্রন্থমেলায় প্রকাশক বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রেকর্ডসংখ্যক বই বেরুলেও অধিকাংশই হয় নিম্নমানের গ্রন্থ। মেলায় ভূরি ভূরি নিম্নমানের বই প্রকাশের মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে বই প্রকাশের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ প্রকাশনীর সম্পাদনা পরিষদ না থাকা। প্রকাশকের সেই খামখেয়ালির যাতনা পোহাতে হয় পাঠককে। এমন প্রেক্ষাপটে গ্রন্থমেলা উপলক্ষে পোনা মাছ উৎপাদনের মতোই প্রকাশিত হয় অগণন বই। সেক্ষেত্রে সম্পাদনা পরিষদ ছাড়াই প্রকাশিত অধিকাংশ বইয়ের বিষয়বস্তু থেকে শুরু বানান ভুল, বাক্য গঠনের ত্রুটিসহ অন্তঃসারশূন্যতা থেকে মুখ্য এতে জব্বরের।

বাংলা একাডেমির তথ্যানুযায়ী, গত বছরের গ্রন্থমেলায় (বাংলা) প্রকাশিত হয়েছে সাড়ে চার হাজারের বেশি বই। এই বিপুলসংখ্যক বইয়ের মধ্যে একাডেমির বিবেচনায় মানসম্মত বইয়ের সংখ্যা ছিল ৪৮৮। এবারও মেলায় অংশ নিচ্ছে সাড়ে চারশর বেশি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। সেই সুবাদে হুজুগে লেখক আর মৌসুমি প্রকাশকের প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছাড়িয়ে যেতে পুরনো রেকর্ডকে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গ্রন্থ মূল্যায়নে হাতেগোনা কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থা ছাড়া অধিকাংশ প্রকাশনীর নেই কোন সম্পাদনা পরিষদ। সেই সুযোগে প্রকাশিত হয় যেমন খুশি তেমন বই। এমন পরিস্থিতিতে প্রকাশনাশিল্পে সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়ে প্রকাশকদের অধিক যত্নশীল হওয়ার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টজনরা। উপযুক্ত সম্পাদনা পরিষদ ছাড়া প্রকাশনাশিল্পে না আসার বিষয়ে জোরালো দাবি উঠেছে।

আবার কেউ বলছেন, যত বেশি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে তত সংখ্যক সম্পাদক নেই। তাছাড়া প্রতিটি প্রকাশনা সংস্থার সম্পাদনা পরিষদ রাখতে হলে বইয়ের মূল্য আরও বেড়ে যাবে। যদিও সম্পাদনা পরিষদ আছে এমন প্রকাশনা সংস্থা এবং সম্পাদনা পরিষদ নেই এমন প্রকাশনীর বইয়ের মূল্যের মাঝে তেমন পার্থক্য নেই।

এ বিষয়ে কথা হয় খ্যাতনামা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) প্রকাশক মহিউদ্দীন আহমেদের সঙ্গে। এই ইমেরিটাস প্রকাশক বলেন, সম্পাদনা পরিষদ ছাড়া কখনই ভাল প্রকাশনা সংস্থা গড়া সম্ভব নয়। প্রকাশনাশিল্পে আসতে হলে প্রকাশককে অবশ্যই কিছু বাধ্যবাধকতা মানতে হবে। প্রথমেই মাথায় রাখতে হবে, যে লেখকের বইটি প্রকাশ করব সেটি কেন করব? সুলেখনীর সঙ্গে ভাল হতে হবে বইয়ের অন্তর্নিহিত বিষয়বস্তু।

বইটি সম্পর্কে প্রথমে প্রকাশকের নিজের ভাল ধারণা থাকতে হবে। তারপর সেটিকে তুলে দিতে হবে সম্পাদনা পরিষদের হাতে। এরপর গ্রন্থ সম্পাদক যখন বলবেন, বইটি ভাল হয়েছে তখনই আমি গ্রন্থটি প্রকাশে রাজি হবো। কারণ সম্পাদক কিংবা সম্পাদনা পরিষদ ছাড়া বিষয়বস্তু থেকে শুরু করে শুদ্ধ বানান কিংবা সঠিক বাক্যরীতি মেনে মানসম্মত গ্রন্থ প্রকাশ সম্ভব নয়। প্রকাশনাশিল্পের উৎকর্ষগত স্বার্থেই সম্পাদনা পরিষদের ব্যয় যদি কেউ নির্বাহ করতে না পারে তাহলে সেসব প্রকাশকের প্রকাশনী প্রতিষ্ঠান খোলার প্রয়োজন নেই।

এ বিষয়ে কিছুটা ভিন্নমত প্রকাশ করে জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, এদেশের প্রকাশনাশিল্প এখনো সেভাবে বিকশিত হয়নি। ব্যবসাটাও খুব বড় হয়নি। বেশিরভাগ প্রকাশকেরই আয় সীমাবদ্ধ। সে কারণে তাদের পক্ষে সম্পাদনা পরিষদের খরচ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। তবে এই সীমাবদ্ধতার মাঝে হুজুগে পড়ে বই প্রকাশ করা উচিত নয়। এক সময় হয়তো সবাই গ্রন্থের মানের দিকেই নজর দেবে। প্রতি বছর গ্রন্থমেলায় অসংখ্য বই প্রকাশের মাধ্যমে এক ধরনের ইতিবাচক সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটে।

কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, সম্পাদনা পরিষদের পরিচর্যা ছাড়া পশ্চিমা বিশ্বে কোন বই প্রকাশিত হয় না। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও সম্পাদনা পরিষদ ছাড়া কোন প্রকাশনা সংস্থা গড়ে ওঠে না। এই বিবেচনায় আমাদের দেশের প্রকাশনা শিল্পের বড় সমস্যাটি হচ্ছে, অভিজ্ঞ সম্পাদকের অভাব। যত বেশি প্রকাশনা সংস্থা রয়েছে সেই তুলনায় সম্পাদক তৈরি হয়নি। অন্যদিকে নবীন এই শিল্পের পুঁজি খুব কম। সম্পাদনা পরিষদ রাখতে হলে প্রকাশকের খরচ বেড়ে যাবে। সেই সূত্র ধরে বইয়ের দামটিও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

উল্টোদিকে সম্পাদনা পরিষদের হস্তক্ষেপ ছাড়া বই প্রকাশের বিরোধিতা করে অন্যপ্রকাশের প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম বলেন, সম্পাদনার টেবিল ঘুরেই প্রতিটি বই প্রকাশিত হওয়া উচিত। প্রকাশনার ক্ষেত্রে আমরা এই নীতিমালাই অনুসরণ করি। এ কারণেই আমরা একটি শক্তিশালী সম্পাদনা পরিষদ দাঁড় করিয়েছি। তবে আক্ষেপের বিষয় হচ্ছে, এদেশের প্রকাশনাশিল্পে হাতেগোনা কয়েকটি প্রকাশনীর সম্পাদনা পরিষদ রয়েছে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্পাদনা পরিষদকে পাশ কাটিয়ে প্রকাশিত মানহীন গ্রন্থপাঠে বিরক্ত হন পাঠক। অনেক সময় নবীন লেখকদের বই প্রকাশের অত্যুৎসাহী প্রবণতাও মানহীন বইয়ে পরিণত হয় উল্লেখ করে এই প্রকাশক বলেন, শুরুতে নবীন লেখকরা তাদের বই প্রকাশনার বিষয়ে বড্ড বেশি উদগ্রীব থাকে। তখন তারা মানসম্পন্ন লেখার চেয়ে বই প্রকাশেই বেশি মনোযোগী হয়। তরুণ লেখকদের উচিত সূচনালগ্নে দৈনিক ও পাক্ষিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে নিয়মিত লেখালেখি করা। এতে তাদের লেখার হাতটি যেমন ভাল হবে, তেমনি উৎকর্ষমূলক লেখনীর মাধ্যমে পাঠকের কাছে পরিচিতি পাবে।

মানহীন গ্রন্থের জন্য মৌসুমি প্রকাশকদের দায়ী করে বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সাবেক সভাপতি এবং আগামী প্রকাশনীর প্রকাশক ওসমান গনি বলেন, একুশে গ্রন্থমেলা এলেই আবির্ভূত হয় মৌসুমি প্রকাশকরা। এসব প্রকাশকের প্রকাশনা সংস্থার অধিকাংশের সম্পাদনা পরিষদ তো দূরের কথা, প্রুফ রিডারও থাকে না।

ফলে তাদের দ্বারা প্রকাশিত বইও হয় মানহীন। এতে পাঠক বিরক্ত ও বিভ্রান্ত হয় ক্ষতিগ্রস্ত হয় সৃজনশীল প্রকাশনাশিল্প। এবারও ভুঁইফোড় প্রকাশনা সংস্থায় ভরে গেছে গ্রন্থমেলা। প্রকাশনা সংস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সম্পাদনা পরিষদ থাকার বাধ্যবাধতা থাকলে ঝরে যাবে এসব নামসর্বস্ব প্রকাশনী। তাদের কারণে আমাদের মতো পেশাদার প্রকাশকরাও কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

এই শিল্পে যদি আসতেই হয় তবে প্রকাশককে একইসঙ্গে পেশাদার ও সৃজনশীল মননের হতে হবে। এখনকার পাঠকরা অনেক সচেতন। তাই মৌসুমি প্রকাশকদের প্রকাশিত মানহীন বইয়ের দায় পেশাদার প্রকাশকেরও ঘাড়ে চেপে বসে।

সম্পাদনা ছাড়া প্রকাশিত মানহীন বইকে কাগজ ও কালির অপচয় উল্লেখ করে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্সের প্রকাশক কামরুল হাসান শায়ক বলেন, ত্রুটিমুক্ত প্রকাশনার জন্য দেশের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদদের নিয়ে আমাদের সম্পাদনা পরিষদ গঠিত হয়েছে।

এই পরিষদ ছাড়া পাঠকের মনন উপযোগী মাননসম্পন্ন প্রকাশ করাও সম্ভব না। কিন্তু বর্তমানে যারা প্রকাশনাশিল্পে আসছে তাদের কেউই সম্পাদনা পরিষদের তোয়াক্কা করেন না। ফলে তারা কিছু বই প্রকাশ করলেও প্রকৃত অর্থে সেগুলোর মাধ্যমে কালি কাগজের অপচয় ছাড়া আর কিছুই হয় না।

ক্রমশই দেশের প্রকাশনাশিল্পে কর্পোরেট কালচার যুক্ত হচ্ছে। অতএব সম্পাদনা পরিষদ ছাড়া প্রকাশনী গড়লেও একসময় এসব প্রতিষ্ঠানকে হারিয়ে যেতে হবে।

সূত্র: দৈনিকশিক্ষা

আপনার মতামত লিখুন

শিক্ষা বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ