সোমবার,২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং,৯ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, সময়: সন্ধ্যা ৭:০৪
সরকারি হলো আরও ৪৩ হাইস্কুল নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী মা হলেন অভিনেত্রী শায়লা সাবি আরও ৫ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায়! রাজাপুরে গাঁজাসহ মাদক কারবারি আটক খালেদার চিকিৎসার নির্দেশনা চেয়ে রিট শুনানি মঙ্গলবার দর্শকদের গায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লেন রণবীর!

গ্রামে তাল অর্থনীতি, বজ্র ঠেকায় তাল গাছ

মুক্তিনিউজ24.কম ডেস্ক: ‘তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে ,উঁকি মারে আকাশে’ শৈশবকে নাড়া দেওয়া এমন কবিতা যেমন লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, তেমনি তাল রয়েছে খনার বচনেও। তাল নিয়ে আছে ডজন ডজন কবিতা, ছড়া বা গল্প।

কিন্তু তাল এখন ছড়া ও কবিতা থেকে বেরিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতে স্থান করে নিচ্ছে। শুধু অর্থনীতি নয়, তালগাছ বজ্রপাতের মতো দুর্যোগ প্রতিরোধে অন্যতম নিয়ামক। সরকার উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিটি উপজেলায় রোপণ করা হবে ভূমি ক্ষয়রোধক তালগাছ। তালগাছ থেকে আহরিত দ্রব্য কয়েক স্তরে মূল্য সংযোজিত হচ্ছে। তাল দেশের গুরুত্বপূর্ণ অপ্রচলিত ফল।

পাথরঘাটা উপজেলার রায়হানপুর ইউনিয়নের গোলবুনিয়া গ্রামের অশেষ বরণ তালুকদার একজন সাধারণ কৃষক। বাড়ির ঝোঁপে বেড়ে ওঠা পাঁচটি তাল গাছের কাঁচা তাল বিক্রি করেছেন তিন হাজার টাকায়। তিনি অবশ্য তিন শাঁসসহ প্রতিটি তাল বিক্রি করেছেন এক টাকা দরে। একইভাবে তার প্রতিবেশী দেবব্রত গোমস্তা ও গৌতম গোমস্তা তাদের বাড়ির ঝোঁপঝাড়ে বা রাস্তার পাশে বেড়ে ওঠা তালগাছের সকল কাঁচা তাল বিক্রি করে দিয়েছেন বিভিন্ন দরে।

চরদুয়ানী ইউনিয়নের দক্ষিণ চরদুয়ানীর আবদুল করিম বলেন, তিনি প্রতিবছর তালের রস থেকে গুড় তৈরি করে বাজারে বিক্রি করে ২০-২৫ হাজার টাকা টাকা আয় করে থাকেন। সবাই এভাবে অর্জিত টাকা দিয়ে পরিবারের ছোটখাট ব্যয় নির্বাহ করেন। প্রতিবছর এভাবেই প্রত্যেকে তাল বিক্রির টাকা আয় ধরে পরিবারের ব্যয় নির্বাহের হিসাব কষে থাকেন।

গ্রাম থেকে শহরে কাঁচা তাল চালান দেন উপজেলার কাকচিড়া ইউনিয়নের মো. জাফর হাওলাদার। তিনি বলেন, প্রতিদিন লঞ্চে বোঝাই করে ঢাকার শ্যাম বাজারে পাঠাই। বরগুনা থেকে ঢাকাগামী একটি দোতলা লঞ্চের সুপারভাইজার মো. আলম বলেন, বৈশাখ ও জৈষ্ঠ মাসে বরগুনা থেকে বেতাগী পর্যন্ত প্রতিঘাট থেকে শত শত কাঁচা তালের ছড়া ঢাকায় যায়।

ঢাকার শ্যামবাজারের আড়তদার মো. আজাদ মিয়া বলেন, লঞ্চে প্রতিদিন উপকূল এলাকা থেকে এক হাজার থেকে ১২০০ ছড়া (প্রতিটিতে ২০-২৫টি) বিক্রির জন্য আসে। মৌসুমে এভাবে কাওরান বাজার, সোয়ারি ঘাট, যাত্রাবাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে ২০ থেকে ২৫ হাজার ছড়া তাল বিক্রির জন্য পৌঁছায়। ঢাকায় দৈনিক তালের শাঁস বিক্রি থেকে ৫০ লাখ টাকার লেনদেন হয় বলে জানান শ্যামবাজারের আড়তদার মো. আজাদ মিয়া। অর্থনীতিতে তাল গাছের রয়েছে বহুমূখী অবদান।

প্রতিটি তালে দুই থেকে তিনটি শাঁস হয়। গ্রীস্মের সময় কচি অবস্থায় তালের শাঁস ব্যাপক চাহিদা থাকে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত। হাত বদল হয়ে বরিশাল বা ঢাকায় পৌঁছে প্রতিটি তালের (তিন শাঁস) মূল্য দাঁড়ায় ১৫ টাকা। তালের রস, রস থেকে গুড় তৈরি, তাল মিসরি, পাকা তালের পিঠা, পাকা তালের শাঁস দিয়ে তৈরি হয় সুস্বাদু মোরব্বা,তালের পাখা, একসময় পাঠশালায় লেখার জন্য ব্যবহৃত হতো তালপাতা। তালের কাঠ গ্রামীণ আবাসন তৈরিতে মূল্যবান কাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ২৫-৩৫ বছর বয়সের একটি তাল গাছের মূল্য প্রায় ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে মন্তব্য করেন পাথরঘাটা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষিবিদ মো. আবদুল হাকিম।

মৌসুমে (মার্চ থেকে জুন) একটি তালগাছ থেকে ৭০০ থেকে ১৫০০ লিটার রস সংগ্রহ সম্ভব। পুরুষ-স্ত্রী উভয় প্রকার গাছ থেকেই রস সংগ্রহ করা সম্ভব। তালের রয়েছে ওষধি গুণসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অন্য ফলের তুলনায় এ ফলে ক্যালসিয়াম, লৌহ, আঁশ ও ক্যালরির উপস্থিতি অনেক বেশি।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েরর কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. বদিউজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ অপ্রচলিত ফল হচ্ছে তাল, গ্রামীণ অর্থনীতিতে তাল গাছের অবদান ফেলনা কিছু নয় বরং টেকসই, লবণ সহিষ্ণু, ভূমিক্ষয় ও ঝড় বাদল প্রতিরোধক একটি গুচ্ছমূল প্রজাতির একটি গাছ। কৃষকের বাৎসরিক পারিবারিক বাজেটে ভূমিকা রয়েছে এ গাছের। ধান বা পাট খেতে অথবা উপকূলের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে তাল গাছের বাগান করা যায়। সৌদি আরবে একই প্রজাতির খেজুর গাছের বাগান করা হয়। তাদের অর্থনীতিতে এর অবদান অনেক।

শুধু অর্থনীতি নয় তাল গাছ বজ্রপাতের মতো দুর্যোগ প্রতিরোধে অন্যতম নিয়ামক বলে জানালেন বরগুনার জেলা প্রশাসক মো. মোখলেসুর রহমান। তিনি বলেন, ‘সরকারের উদ্যোগে সারা দেশে তাল বীজ লাগানো হচ্ছে। এ বছর বরগুনা জেলার ছয়টি উপজেলার বিভিন্ন সড়ক, পুকুরপাড় ও খালের পাড়ে ছয় লাখ তাল গাছের বীজ বপন করা হবে।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অনুষদের ইমারজেন্সি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. সামসুজ্জোহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিক দুর্যোগ, বজ্রপাত থেকে রক্ষার পাওয়ার জন্য উঁচু তালগাছ ব্যবহার আমাদের লোকায়ত জ্ঞানকে ব্যবহার করা হচ্ছে। বজ্রপাত বেড়ে যাওয়া এবং গ্রামে তালগাছ কমে যাওয়ার কারণেই দেশে বজ্রপাত আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। তালগাছ উঁচু হওয়ায় বজ্রপাত নিজে গ্রহণ করে মানুষসহ প্রাণিদের রক্ষা করে থাকে।

আপনার মতামত লিখুন

ঢাকা,রংপুর,সারাদেশ বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ