শুক্রবার,১৮ই জানুয়ারি, ২০১৯ ইং,৫ই মাঘ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, সময়: সকাল ১১:৩১
হজ যাত্রীদের বিমান ভাড়া কমলো ১০ হাজার ১৯১ টাকা শনিবারের জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন স্থগিত সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর বরিশালে মাদকাসক্ত ছেলেকে পুলিশে সোর্পদ করলেন মা সৈয়দপুরে ছাদ থেকে পড়ে কলেজ ছাত্রীর মৃত্যু ‘গ্রাজ্যুয়েটরা কেরানি হওয়ার স্বপ্ন দেখলে চলবে না’ ডোমারে গোমনাতী মহাবিদ্যালয়ে নবীণ বরণ অনুষ্ঠিত।

প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীরা টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা

আ জার্নি বাই বাস

মুক্তিনিউজ২৪.কম ডেস্ক: জাতীয় সংসদ ভবনের মিডিয়া সেন্টারের সামনে রোদের ঝিলিক। শীতের হাওয়ায় ততটা কাঁপন নেই। সেখানে প্রস্তুত তিনটি বাস। একেকটি বাসে আসন ২৮টি। মুজিব কোট পরা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রীরা একে একে বাসে উঠলেন। সবার আগে উঠলেন ওবায়দুল কাদের। তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, তার ওপর সড়কমন্ত্রীও। সড়ক ধরে বাসগুলো চলবে—সড়কমন্ত্রীকে তো আগে উঠতেই হবে!

মাওয়া সড়ক ধরে ফেরি পার হয়ে বাসগুলো ছুটবে টুঙ্গিপাড়ায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে আগেই হেলিকপ্টারযোগে পৌঁছে যাবেন। সবাই শ্রদ্ধা জানাবেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে।

নতুন সরকারের মন্ত্রীদের প্রথম কর্মদিবস পার হওয়ার পর গতকাল বুধবার ছিল দ্বিতীয় কর্মদিবস। দিবসের শুরুতেই এই বাসযাত্রায় তাঁরা বেশির ভাগই ছিলেন চুপচাপ। আগের দিনের কর্মব্যস্ততা, ভালোবাসার ফুল নিতে নিতে ক্লান্তির রেশ ছিল চোখে-মুখে। রাতে কারো কারো দেরিতে ঘুমাতে যেতে হয়েছে।

ভোরে জেগে উঠে, সাতসকালে বাসে চড়ে তাঁরা যেন একটু বিশ্রামই নিচ্ছিলেন।

তাঁরা আগের দিনের জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাওয়া-আসার সময় পতাকাবাহী গাড়ি ব্যবহার করেননি। টুঙ্গিপাড়ায় গেলেনও বাসে, ফিরলেনও একইভাবে। বাসগুলো এনা পরিবহন কম্পানির। বাস চলা শুরুর পর কেউ অবশ্য মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন, কেউ পর্দা সরিয়ে কাচের জানালায় দেখে নিচ্ছিলেন আকাশটা। আহা, কী খোলা আকাশ! নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম কর্মদিবসে মোটরসাইকেলে সহযাত্রী হয়ে নিজের দপ্তরে গিয়েছিলেন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহেমদ পলক। সারিবদ্ধ বাসের প্রথমটিতেই পলক উঠেছেন। তিনিও মোবাইল ফোনে ব্যস্ত। পলকহীন-ব্যস্ত পলকের পাশেই অন্য আরেক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ছিলেন স্থির, নীরব।

সকাল ৭টায় যাত্রা শুরু করে শিমুলিয়া ঘাট হয়ে পদ্মার ওপরে ফেরিতে উঠতে বাসগুলোর লাগল প্রায় দুই ঘণ্টা। ৩ নম্বর রো রো ফেরিঘাটে ওবায়দুল কাদের সরব হয়ে ওঠেন। তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘বিএনপি ১০ বছরে ১০ মিনিটের জন্য আন্দোলন করতে পারেনি, তারা এখন কী করবে? তারা যদি রাজনৈতিকভাবে আন্দোলন করে, তবে আমরা রাজনৈতিকভাবে তার সমুচিত জবাব দেব।’

সকাল ৯টার দিকে মন্ত্রীদের বহনকারী বাসগুলো শিমুলিয়া ঘাটে পৌঁছেছিল। তখন ভালোবাসার ফুলে সিক্ত হন মন্ত্রীরা। স্থানীয় নেতা, প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা মন্ত্রীদের কাছে পেয়ে ছিলেন ভীষণ খুশি। ফেরিতে উঠে মন্ত্রীরা ঘাটে উপস্থিতজনদের উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। ফেরি চলছিল আর মন্ত্রীরা দেখছিলেন পদ্মা সেতুর বিভিন্ন অংশ। তখন তাঁরা বেশ উচ্ছ্বসিত।

সকাল পৌনে ১১টায় ফেরিতেই ছিলেন মন্ত্রীরা। পদ্মার স্রোত বয়ে চলছিল। ফেরিতে বাস থেকে নেমে বেশির ভাগই দোতলায় গেলেন। একটি অংশ গেল তৃতীয় তলায়। ফেরির নাম ‘মেরী ক্যামেলিয়া’। পদ্মায় চর পড়ে গেছে, ছুটতে পারছিল না জোরে। মন্ত্রীরা এই ফাঁকে নদীর ছবি তুলছিলেন, স্রোতের খেলা দেখছিলেন, দেখছিলেন চর। কারো মগ্নতায় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ‘জরুরি ফোন’। মোবাইল ফোন এখানেও অবিরত বেজে ওঠে। তিনটি বাসেই আপ্যায়নের জন্য ছিল স্যান্ডউইচ, ডেনিশ, আপেল, কমলা, পেয়ারা, বরই, ঠাণ্ডা পানীয় ও সাধারণ বোতলজাত পানি। তবে ফেরিতে মন্ত্রীদের আপ্যায়নের জন্য ছিল পাউরুটি, কলা, কমলা, চা ও কফি।

টুঙ্গিপাড়া থেকে ফিরতে ফিরতে গল্প করছিলেন মন্ত্রীরা। জমে উঠছিল নানা গল্প। বিকেল সাড়ে ৫টায় বাসগুলো ফরিদপুরের ভাঙ্গা অতিক্রম করছিল। পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের একপাশে বসেছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন এবং অন্য পাশে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম। এম এ মান্নান বাসের ভেতরের পরিবেশ বর্ণনা করেন কালের কণ্ঠ’র কাছে, ‘আমরা যাওয়ার সময় একটু গম্ভীর ছিলাম। ফেরার সময় পিকনিক পিকনিক ভাব। আমার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন তরুণ এক মন্ত্রী জাভেদ। আমরা বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানানোর পর নতুন শক্তিতে একসঙ্গে আরো উদ্যমে কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ হলাম।’

বাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল মোমেনের পাশেই ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। কাছেই ছিলেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। সন্ধ্যায় বাসে জমে উঠেছিল গল্পগুজব। ওই বাসেই ছিলেন ওবায়দুল কাদের। মোমেন বলেন, ‘এই বাসযাত্রার মধ্য দিয়ে আমরা অন্য রকম বাংলাদেশ গড়ার প্রতিচ্ছবি দেখছি। জ্বালানি খরচ বেঁচে গেল, নেই গাড়িবিলাসিতা। এ তো নতুন করে পথচলা। আমরা ফেরার পথে গল্পে মশগুল আছি। আমরা উচ্ছ্বসিত। একজনের সঙ্গে আরেকজনের কোনো দূরত্ব নেই। একসঙ্গে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে একসঙ্গে চলার উদ্যোগটি ভালো লাগার মতো।’

ঢাকা থেকে যাওয়ার পথে সারির সামনের বাসের চালক ছিলেন মিজানুর রহমান। তাঁর বাসের ২৮টি আসনের মধ্যে একটি ছিল খালি। এই বাসে ওবায়দুল কাদের বসেছিলেন চালকের পেছনেই। একই বাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন। টানা কথা বলতে পারেন তিনি। দায়িত্ব পাওয়ার পর অবশ্য একটু কমই কথা বলছেন। তবে ফেরার পথে তিনি ছিলেন বেশি উচ্ছ্বসিত।

শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি, শিক্ষা উপমন্ত্রী মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, ডাক, টেলি যোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার, আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহেমদ পলক, পাট ও বস্ত্র মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীও একই বাসে ছিলেন।

চালক মিজান ঢাকা-কক্সবাজার রুটে বাসটি চালান। এবার ঢাকা-মাওয়া হয়ে চলতে চলতে দেখেন, কোথাও কোথাও কাজ চলছে সড়কে। সকালে বাস চলছিল গড়ে ৬০ কিলোমিটার গতিতে। মিজান গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টায় টুঙ্গিপাড়ায় অবস্থানকালে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার পেছনেই বসেছিলেন কাদের স্যার। তিনি আরামেই বসেছিলেন।’

জাহাঙ্গীর আলম চালাচ্ছিলেন সারির দ্বিতীয় বাসটি। তিনি বাসটি চালান ঢাকা-সিলেট পথে। কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল, প্রতিমন্ত্রী শাহিরয়ার আলমও ছিলেন ওই বাসে। বললেন, সড়কে যানজট ছিল না। অন্য বাসটির চালক মো. মাসুদ যাত্রী হিসেবে মন্ত্রীদের পেয়ে খুশিতে ডগমগ ছিলেন। গতকাল রাত ৯টায় মানিকগঞ্জ অতিক্রম করছিল বাসগুলো। পথে পথে দলীয় নেতাকর্মীরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিচ্ছিল। প্রথম বাসে ছিলেন ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির দপ্তর সম্পাদক সামদানী খন্দকার। সড়কমন্ত্রীর সঙ্গে নিজে সেলফি তুলে ছিলেন ভীষণ খুশি।

বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীদের শ্রদ্ধা

আমাদের গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গতকাল দুপুর সোয়া ১২টায় হেলিকপ্টারযোগে টুঙ্গিপাড়ায় পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। টানা তৃতীয়বারসহ চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়ে এবং নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানান তিনি। ওই সময় দলের স্থানীয় নেতাকর্মী ও পদস্থ কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানান। দুপুর সাড়ে ১২টায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিস্থলে উপস্থিত হয়ে সমাধির বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন প্রধানমন্ত্রী। ওই সময় সশস্ত্র বাহিনীর একটি দল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গার্ড অব অনার প্রদান করে।

বঙ্গবন্ধুর সমাধি কমপ্লেক্স থেকে বের হয়ে প্রধানমন্ত্রী গাড়িতে না উঠে আধাকিলোমিটারের বেশি রাস্তা হেঁটে ঢাকায় ফেরার জন্য হেলিকপ্টারে গিয়ে ওঠেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছোট বোন রেহানাও ছিলেন। সমাধি কমপ্লেক্স থেকে বের হয়ে কর্মকর্তাদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীকে বলতে শোনা যায়, ‘এটুকু পথ তো হেঁটেই যাওয়া যায়।’ অগত্যা নিরাপত্তারক্ষীরাসহ সবাই গত সেপ্টেম্বর ৭২ বছরে পা রাখা প্রধানমন্ত্রীর পেছনে হাঁটা ধরেন।

১টা ৩৭ মিনিটে বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানান মন্ত্রিসভার সদস্যরা। শ্রদ্ধা নিবেদনের পর দোয়া ও মোনাজাত করেন। পরে তাঁরা বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ কমপ্লেক্স মসজিদে মিলাদ মাহফিলে যোগ দেন।

বাসযাত্রার বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ‘নাড়ির টানে আমরা জাতির পিতার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি। একসঙ্গে তাই বাসে করে এলাম। পিতার কাছে আসব—এটা কোনো বিলাসিতার জায়গা নয়। সবাই একসঙ্গে বাসে করে আনন্দ করতে করতে এসেছি।’

বিকেল পৌনে ৪টায় তাঁরা টুঙ্গিপাড়া থেকে ঢাকার পথে রওনা দেন।সূত্র: কালের কন্ঠ

আপনার মতামত লিখুন

জাতীয়,সারাদেশ বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ