বুধবার,২২শে নভেম্বর, ২০১৭ ইং,৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, সময়: সকাল ১১:৩০
‘দুধের মতো’ সাদা কুমির, রহস্য কী? লেবাননে ফিরেছেন পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়া হারিরি সুন্দরবনে ‘বন্দুকযুদ্ধে দস্যু গামা’ নিহত আমেরিকান দূতাবাস বৃহস্পতিবার বন্ধ থাকবে ফুড পান্ডায় ব্র্যান্ড প্রোমোটোর ও এরিয়া ম্যানেজার প্রয়োজন বাগেরাহাটে ১হাজার পিচ ইয়াবা সহ আটক-২ সখিপুরে রহিম বকস ইন্টান্যাশনালে অগ্নিকান্ডে দোকান ভষ্মিভূত

আবারও নতুন ১৪০ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের আবেদন

মুক্তিনিউজ২৪.কম ডেস্ক:  দেশে এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৯৫টি। রাজধানী ও অন্য মহানগরীর অলিগলি, জেলা শহর এমনকি উপজেলাতেও তা অনুমোদন দেয়া হয়েছে। হাতেগোণ কয়েকটি বাদের বেশিরভাগই চলছে খুড়িয়ে। বাদবাকীরা সনদ বিক্রির দোকান হিসে্বে শিক্ষাবিদদের মধ্যে পরিচিতি পেয়েছে।   এরপরও অনুমোদন চেয়ে ১৪০টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে কয়েক মাসে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ১৯টির প্রস্তাব পরিদর্শন করে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে মন্ত্রণালয়ে।

নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদনকারীদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগসহ ক্ষমতাসীন জোট সরকারের শরিক দলের নেতা। এ ছাড়া আছেন সরকারপন্থী ব্যবসায়ী, শিক্ষক নেতা, বেসরকারি সংস্থা (এনজিও)। বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানও আছে আবেদনকারীর তালিকায়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ একাধিক স্থানে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও আবেদন করেছেন।

তবে এ মুহূর্তে নতুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমতি দেয়ার চিন্তাভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বেশকিছু আবেদন জমা আছে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করে সরকার। আবেদনের ওপর বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করে ইউজিসি থেকে প্রতিবেদন আনা হয়েছে। সরকার সিদ্ধান্ত নিলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম  বলেন, বর্তমানে যেসব বিশ্ববিদ্যালয় আছে এর মধ্যে ১০-১২টি মান নিশ্চিত করছে। ২০-২৫টি মান ভালো করার চেষ্টা করছে। বাকিগুলো সনদ বিক্রির দোকান। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে উচ্চশিক্ষার কোনো দোকান হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার অনুমোদন কোনো আনুকূল্যের বিষয় নয়। ঢালাওভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিলে এ খাতে নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে জাতীয়। সুতরাং, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়ার ক্ষেত্রে দলমত নির্বিশেষে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে জাতীয় কমিটি গঠন করা যেতে পারে।

বিভিন্ন সময়ে দেয়া ইউজিসির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে- বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যকের শিক্ষার প্রসার ও মান বাড়ানোর দিকে নজর আছে। অধিকাংশ উদ্যোক্তার নজর ব্যবসায়। স্বামী ভিসি, স্ত্রী কোষাধ্যক্ষ এবং ছেলে রেজিস্ট্রার- এমন বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে। অর্ধেকের বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি, প্রোভিসি ও কোষাধ্যক্ষ নেই। যোগ্য ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নেই। গবেষণায় বরাদ্দ হয় না বললেই চলে। আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা নেই। উদ্যোক্তা বা তাদের সন্তানদের নানা পদে দায়িত্ব পালন ও কমিটিতে বৈঠকের নামে দু’হাতে অর্থ লুটের অভিযোগ প্রকট। টিউশন ফি নির্ধারণে নেই নীতিমালা। বরং অভিযোগ আছে সার্টিফিকেট ব্যবসার। এগুলোতে শিক্ষার নামে বাণিজ্য চলছে।

চলতি বছর এ পর্যন্ত  ৫/৭ বার গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির ব্যাপারে ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে নিতে পরামর্শ দিয়েছে ইউজিসি। এর মধ্যে ২০ জুন ১৬ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে সতর্কতা জারি করে। এ ছাড়া খোদ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এবং ইউজিসির চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা অনিয়মের ব্যাপারে প্রায়ই বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তৃতায় বলে থাকেন।

সূত্রমতে, রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালীরা নামে-বেনামে সংশ্লিষ্ট থাকার কারণেই নিয়ম-নীতি তোয়াক্কা না করার ঘটনা বেশি ঘটছে। সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার ব্যাপারেও উদাসীনতা আছে। পাশাপাশি আছে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে ইউজিসির আইনি কাঠামো এবং জনবলের ঘাটতি।

২০১৫ সালের ৩০ জুন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরা হয়। অভিযোগ করা হয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের জন্য ক্ষেত্রবিশেষে এক থেকে তিন কোটি টাকা পর্যন্ত আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকে।

এমন পরিস্থিতিতে ভালো করে যাচাই-বাছাই ছাড়া নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমতি না দিতে অনুরোধ করেছেন শিক্ষাবিদরা। তারা মনে করেন, এসব আবেদনের পেছনে বাণিজ্যিক স্বার্থই বেশি কাজ করেছে। যেসব জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করলে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যাবে কেবল সেসব জায়গাতেই স্থাপনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

দেশে বর্তমানে ১৩৬টি বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে বেসরকারি ৯৫টি। পাবলিক ৩৯টি। আরও দুটি অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় দুটি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসি সূত্র জানাচ্ছে, নতুন যে ১৪০টি আবেদন জমা আছে তার মধ্যে ১০৯টির পরিদর্শন প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে ইউজিসি। বিদ্যমান প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের জন্য উদ্যোক্তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন জমা দেন। এর ভিত্তিতে ইউজিসি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দিলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়।

ইউজিসি সর্বশেষ যে ১৯টি প্রকল্প পরিদর্শন করে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে, এর মধ্যে ঢাকায় ৩টি এবং রংপুর ও গাজীপুরে ২টি স্থাপনের প্রস্তাব আছে। এ ছাড়া পটুয়াখালী, সিলেট, মুন্সীগঞ্জ, খুলনা, রাজশাহী, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, বান্দরবানে বিশ্ববিদ্যালয় চেয়ে আবেদন আছে। আবেদনকারীদের মধ্যে বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা হিসেবে সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীর নাম আছে। পটুয়াখালীর সাউথ রিজন বিশ্ববিদ্যালয়টি চাচ্ছেন চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ। ইউনিভার্সিটি অব ব্রাহ্মণবাড়িয়া চাচ্ছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। ঢাকা আহছানিয়া মিশন খুলনা ও রাজশাহীতে দুটি বিশ্ববিদ্যালয় চাচ্ছে। এ সংস্থার বর্তমানে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। বাকিগুলোর পেছনেও সরকারদলীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আছেন।

নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের আরও ৮২টি আবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, রাজধানী ও বিভাগীয় শহর মিলিয়ে ২০টি জেলাতেই চাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। এই ২০ জেলার মধ্যে ১০ জেলায় ইতিমধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। অথচ সেখানে আরও ৫২টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। বর্তমানে ঢাকায়ই ৫৪টি বিশ্ববিদ্যালয় আছে।

বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আনোয়ার খান মডার্ন অনুমোদন পায় গত বছরের আগস্টে। কিন্তু এখনও তা চালু করতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। গত বছরের জুনে অনুমোদন পায় রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ এবং রূপায়ণ একেএম শামসুজ্জোহা বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে শেষেরটি চালুর ব্যাপারে এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্টরা ইউজিসিতে যোগাযোগই করেননি। রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। রাজধানীর পার্শ্ববর্তী কেরানীগঞ্জে এটি স্থাপন করা হয়। ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ?ভিলেজ স্থাপিত হয়েছে বরিশালে। এর উদ্যোক্তা হিসেবে বরিশালের ইনফ্রা পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের চেয়ারম্যান ইমরান চৌধুরীর নাম আছে। তবে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজে আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আফজাল হোসেন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ?সুজিত রায় নন্দী, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের একজন সদস্যসহ সরকারদলীয় আরও কয়েকজন আছেন। বিখ্যাত চিকিৎসক এমআর খানের সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অনুমোদন পেলেও চালু হয়নি। এরই মধ্যে এটির মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে।

গত বছরের জানুয়ারিতে ৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পায়। এর মধ্যে ঢাকায় ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব স্কলার এবং কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি, মানিকগঞ্জে এনপিআই ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, খুলনায় নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি, কুষ্টিয়ায় রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রামে ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি। এর মধ্যে একটির পেছনে একটি নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ ব্যক্তি এবং সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও আওয়ামী লীগের একজন এমপি আছেন আরেকটির পেছনে। প্রধানমন্ত্রীর এক উপদেষ্টা আছেন একটির নেপথ্যে। অন্যগুলোর পেছনেও সরকারের প্রভাবশালীরা আছেন।

এভাবে ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মহাজোট এবং বর্তমান সরকার ৪১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিয়েছে। তবে ১৯৯২ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যুগ শুরুর পর সবচেয়ে বেশি অনুমোদন দিয়েছে বিএনপি সরকার। দুই মেয়াদে তারা ৫১টি অনুমোদন দেয়। অবশ্য অনিয়মের দায়ে তারা ৫টি বন্ধও করে।সূএ:

শিক্ষা.কম

আপনার মতামত লিখুন

শিক্ষা বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ