শনিবার,১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং,১লা পৌষ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, সময়: রাত ১০:৫৭
নেতা নয়, সেবক হতে চাই: শেখ তন্ময় ভোটকক্ষে সাংবাদিকরা যা করতে পারবেন, যা পারবেন না ফখর উদ্দিন মোহাম্মদ স্বপনের শেরে-বাংলা পদক লাভ ঈশ্বরদীতে সড়ক দুর্ঘটনায় কিশোরের মৃত্যু মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কলমাকান্দা ইউএনও’র অনন্য নজির জাতীয় স্মৃতিসৌধ প্রস্তুত, থাকবে চার স্তরের নিরাপত্তা বলয় ক্রিকেটে জয়ের ধারা অব্যাহত রাখার আশাবাদ প্রধানমন্ত্রীর

অধ্যক্ষসহ তিন শিক্ষক বরখাস্ত, একজন গ্রেপ্তার

মুক্তিনিউজ২৪.কম ডেস্ক: অরিত্রী অধিকারীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের তিন শিক্ষককে গতকাল বুধবার সাময়িক বরখাস্ত করেছে গভর্নিং বডি। তাঁদের এমপিও সুবিধাও প্রত্যাহার করা হয়েছে। গতকাল সকালে ক্লাস ও পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। রাতে গভর্নিং বডির বৈঠকে শনিবার থেকে পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ক্লাস ও পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এদিকে অরিত্রীর বাবার দায়ের করা মামলাটির  তদন্তভার গতকাল গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়। এরপর রাতেই শ্রেণিশিক্ষক হাসনা হেনাকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি।

গত রাতে প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সভাপতি গোলাম আশরাফ তালুকদার তিন শিক্ষককে বহিষ্কারের সত্যতা কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস, শাখাপ্রধান জিন্নাত আরা ও শ্রেণিশিক্ষক হাসনা হেনাকে সাময়িক বহিষ্কার করেছি। আমাদের তদন্ত কমিটিও কাজ করছে। অন্যান্য যত ব্যবস্থা নিতে হয় আমরা নেব।’ অরিত্রীক আত্মঘাতী হতে প্ররোচনাকারী হিসেবে অধ্যক্ষ, শাখাপ্রধান ও শ্রেণিশিক্ষককে দোষী সাব্যস্ত করে গতকাল প্রতিবেদন জমা দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। দুপুরে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ এবং এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ তুলে ধরেন।

গত রাতে বৈঠক শেষে গভর্নিং বডির সদস্য জাহান মালা কালের কণ্ঠকে বলেন, শনিবার থেকে পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বুধবারের পরীক্ষা নেওয়া হবে আগামীকাল শুক্রবার। আজ বৃহস্পতিবারের স্থগিত পরীক্ষা ১১ ডিসেম্বর মঙ্গলবার নেওয়া হবে। আগামী দু-এক দিনের মধ্যেই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়া হবে বলে সভায় আলোচনা হয়েছে।

এদিকে গতকাল শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার ও র‌্যাব মহাপরিচালকের কাছে চিঠি পাঠিয়ে তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। সেখানে তদন্ত প্রতিবেদনের কপিও সংযুক্ত করা হয়। এ ছাড়া মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে পাঠানো আরেক চিঠিতে তিন শিক্ষকের বেতন-ভাতা বন্ধের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে পাঠানো অন্য চিঠিতে তিন শিক্ষককে বরখাস্তের আদেশ বাস্তবায়নসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

এত সব ব্যবস্থা গ্রহণের পরও শান্ত হয়নি শিক্ষার্থীরা। গতকাল সকাল থেকেই পরীক্ষা বর্জন করে গেটের সামনে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত তারা সেখানে অবস্থান করে। শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগ দাবিই মেনে নেওয়ায় অভিভাবকদের অনুরোধে আন্দোলনকারীদের একাংশ কর্মসূচি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু আরেক অংশকে কোনোভাবেই বোঝাতে পারছিলেন না অভিভাবকরা। বিকেল ৪টার দিকে সবার প্রিয় শিক্ষক মুজিবুর রহমান শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করলে তারা কিছুটা শান্ত হয়। এর পরও শিক্ষার্থীরা ছয় দফা দাবি স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে গতকালের কর্মসূচি শেষ করে।

দাবিগুলো হচ্ছে অভিযুক্ত তিন শিক্ষককে বহিষ্কার, আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান, স্কুলে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন বন্ধ করা, কথায় কথায় টিসি দেওয়ার ভয় দেখানো বন্ধ করা, মানসিক সুস্থতার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে কাউন্সেলিং করানো এবং ভিকারুননিসা নূনের গভর্নিং বডির সব সদস্যকে অপসারণ করা। গত রাতে অনুপ গুহ ঠাকুর নামের একজন অভিভাবক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিক্ষার্থী ও আমাদের মূল যে দাবি ছিল তা মেনে নেওয়া হয়েছে। আর বাকি দাবিগুলোর ব্যাপারেও আমাদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তাই আমরা বাচ্চাদের আপাতত আন্দোলন স্থগিত করতে বলেছি। যদি সব দাবি মানা না হয় তাহলে পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীরা করণীয় ঠিক করবে। আমাদের এ কথায় বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই সম্মত হয়েছে। আশা করছি, কাল থেকে তারা আর আন্দোলনে নামবে না।’

এর আগে দুপুরে সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, অরিত্রী ও তার মা-বাবা যখন আবেদন নিয়ে আসেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, প্রভাতী শাখার প্রধান ও শ্রেণিশিক্ষক ভয়ভীতি দেখান। অরিত্রীর পিতামাতার সঙ্গে অধ্যক্ষ ও শাখাপ্রধান নির্মম ও নির্দয় আচরণ করেন, যা অরিত্রীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। মন্ত্রী বলেন, ‘অরিত্রী পিতামাতার প্রতি অসম্মানের বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি বলেই তাকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয়েছে বলে তদন্ত কমিটির কাছে প্রতীয়মান হয়।’

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘তিন শিক্ষককে বরখাস্ত করার জন্য গভর্নিং বডিকে নির্দেশ দিচ্ছি। বিভাগীয় মামলাসহ অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া এই তিন শিক্ষকের এমপিও বাতিলের সিদ্ধান্ত এরই মধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।’ মন্ত্রী বলেন, প্রতিবেদনে এই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অনিয়ম-অসংগতি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে অধ্যক্ষ নেই। নিয়মের বাইরে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে, সেকশন খোলা হচ্ছে। শাখা খোলার অনুমোদন নেই। তার পরও খোলা হচ্ছে। এ ছাড়া হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হবে বলেও জানান শিক্ষামন্ত্রী। তিনি আরো বলেন, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীকে মানসিক বা শারীরিকভাবে নির্যাতন করা যাবে না। এটি অপরাধ।

গত রাতে ডিবি পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে তিন শিক্ষকের প্ররোচনায় অরিত্রীর মৃত্যু হয়েছে। এই অভিযোগ আমরা তদন্ত করছি। এ ঘটনায় এখনো কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়নি। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, মঙ্গলবার রাতে পল্টন থানায় ‘আত্মহত্যার প্ররোচনাকারী’ হিসেবে অধ্যক্ষ, শাখাপ্রধান ও শ্রেণিশিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করেন অরিত্রীর বাবা দিলীপ অধিকারী।

এদিকে অরিত্রীর বাবার দায়ের করা মামলার এজাহার গতকাল আদালতে পৌঁছলে ঢাকা মহানগর হাকিম সাদবীর ইয়াছির আহসান চৌধুরী তা গ্রহণ করে ৯ জানুয়ারি প্রতিবেদন পেশের তারিখ ঠিক করেন। ৩ ডিসেম্বর দুপুরে রাজধানীর শান্তিনগরের বাসায় অরিত্রীর নিথর দেহ ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।

শ্রেণিশিক্ষক গ্রেপ্তার : অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার মামলায় এই শিক্ষার্থীর শ্রেণিশিক্ষক হাসনা হেনাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল দিবাগত রাত ১১টার দিকে রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার খন্দকার নুরুন্নবী বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, গ্রেপ্তার শেষে শিক্ষক হাসনা হেনাকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

ঢাকা,সারাদেশ বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ